জীবনের
জন্য আকুতি কেমন তীব্র হতে পারে, হৃদয়স্পর্শী হতে পারে, তা জাতীয় বার্ন
ইউনিটে গেলে দেখা যায়। কেউ কাতরাচ্ছেন, কেউ চিৎকার করছেন। আবার কেউ হাউমাউ
করে কাঁদছেন। মনে হতে পারে, নরকের যন্ত্রণা বুঝি পৃথিবীতে নেমে এলো। অসহ্য
যন্ত্রণায় কাতারাচ্ছেন নিতাই সরকার। বয়স ৬২ ছুঁই ছুঁই। ২০ জানুয়ারি
সন্ধ্যায় আশুলিয়া এলাকায় বাসে নিক্ষেপ করা পেট্রলবোমায় আহত হন তিনি। তার
পুরো মুখমণ্ডল ঝলসে গেছে। ‘কোন অপরাধে আমাকে ঝলসে দেয়া হল? রাষ্ট্র কেন
নিরাপত্তা দিচ্ছে না আমাদের?’ বলতে বলতেই কেঁদে উঠলেন। কান্নার সময় ক্ষত
থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করে। মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে কলেজছাত্র সানজিদ
হোসেন অভি। সে রাজধানীর লক্ষ্মীবাজারের সরকারি কবি কাজী নজরুল ইসলাম কলেজের
একাদশ শ্রেণীর ছাত্র। অভির বাম চোখ নষ্ট হয়ে গেছে এবং মুখের বাম পাশের
চোয়াল ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। মা নুরজাহান বেগম বলেন, অভি যন্ত্রণায় ঘুমাতে
পারে না। বেড থেকে লাফ দিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ
হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন ২১ জনের মধ্যে ৪ জনের শংকা এখনও
কাটেনি। এই ৪ জনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে।
ট্রাকের
হেলপার আরমান মিয়া। পেট্রলবোমার আগুন তাকে জ্বালিয়েছে। হাসপাতাল থেকে বের
হতে বিলাপ করছে বারেবারে। কারণ, তার ছোট্ট সংসারে কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন
অতিথি আসবে। এই সময়টুকুতে স্ত্রী শিল্পী আক্তারের সঙ্গেই থাকার কথা তার।
পুড়ে যাওয়া শরীরের সব শক্তি জড়ো করে যখন বলে উঠেন ‘আমাকে যেতে দাও, স্ত্রীর
কাছে, আমাদের সন্তান আসবে।’ স্বামীর চোখের কাছে চোখ রেখে কাঁদছে শেফালী
আক্তার। ‘একটিবারের জন্য চোখ খোল’ শুধু একটি বার...। স্বামী মাঈনউদ্দিন
চেষ্টা করেও চোখ খুলতে পারেন না। ২০ জানুয়ারি ফেনীতে পেট্রলবোমার আঘাতে
ঝলসে যায় তার পুরো মুখসহ শরীরের ২৪ শতাংশ। স্ত্রীর ভাষ্য, তিনিই (স্বামী)
আমাদের সব। তাকে যে করেই হউক বাঁচাতে চাই।ট্রাকের
ড্রাইভার পিয়ার মিয়া। বয়স ৬৫ ছুঁই ছুঁই। দিন যত যাচ্ছে, ক্ষতগুলো দেবে
যাচ্ছে। যন্ত্রণাও বাড়ছে। চামড়া প্রতিস্থাপন জরুরি হয়ে পড়েছে। সাদা দাড়ি,
চুলগুলো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। নির্বাক তাকিয়ে ছাড়া আর যেন কিছুই করার নেই
স্ত্রী সামসুন্নাহারের। বললেন, তার স্বামীর কী অপরাধ ছিল? ১০ জানুয়ারি
কুমিল্লায় ট্রাকের দরজা বন্ধ করে তার নাতির বয়সী ছেলেরা পেট্রলবোমা মারলো।
কি করে সম্ভব হল...’ বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন অসহায় সামসুন্নাহার। পঞ্চগড়ের
অমূল্য বর্মণ। রিকশাচালক। তিন বছর ধরে রাজধানীতে রিকশা চালান। তাও ভাড়ায়।
১০ জানুয়ারি বাড়িতে ফেরার জন্য বাসে করে তেজগাঁও বরাবর যেতেই বাসে নিক্ষেপ
করা হয় পেট্রলবোমা। মুহূর্তে ঝলসে যায় তার মুখ, বুকসহ শরীরের বিভিন্ন
স্থান। স্ত্রী রত্না রানী বেডের পাশে বসে শুধুই কাঁদেন। সিদ্দিকুর রহমানের
দু’হাত বেয়ে পুচ পড়ছে। ডাক্তার বলছে, হাত দুটো ভালো হলেও একপর্যায়ে কুঁচকে
যাবে। চোখ নাড়িয়ে নাড়িয়ে হাত দেখে সিদ্দিকুর। সিএনজি অটোরিকশা চালাতেন
তিনি। দু’সন্তান সামি (৪) ও রামিকে (২) কে দেখবে। যদি তার কিছু হয়ে যায়।
এমন প্রশ্ন ছুড়ে কান্না করছিলেন স্ত্রী শরিফা আক্তার। জানালেন, দু’হাতসহ
তার বুকের বেশির ভাগ অংশই ঝলসে গেছে। দেবে যাচ্ছে ক্ষতগুলো। নিবিড়
পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে রয়েছেন অবরোধের আগুনে দগ্ধ চার জন। ডাক্তার বলছেন,
তাদের অবস্থা তেমন ভালো নয়। ট্রাক ড্রাইভার সিদ্দিক মিয়া, পুলিশ সদস্য
মোর্শেদ আলম, ব্যবসায়ী আবু তাহের ও গার্মেন্টকর্মী বিল্লাল হোসেন। তাদের
পরিবারের স্বজনদের সান্ত্বনা দেয়ারও যেন কেউ নেই। সিদ্দিক মিয়ার স্ত্রী
পারভীন আক্তার জানান, ছেলে পারভেজ ও শিরিন নাবালক। তার কিছু হলে কিভাবে
বাঁচব। মোর্শেদ আলমের স্ত্রী মাহমুদা বেগম জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে পুলিশে
চাকরি করছেন স্বামী। গাড়ি চালান। ১৭ জানুয়ারি মৎস্য ভবনের সামনে পেট্রল
মারা হয় তার গাড়িতে।www.24banglanewspaper.com
বিল্লাল হোসেনের বাবা আলী আহম্মেদ কেঁদেই যাচ্ছেন।
বললেন, ছেলেই সংসার চালায়। ২ মাসের একটি সন্তান আছে তার। স্ত্রী সীমা
আক্তার ছোট্ট শিশুকে কোলে নিয়ে বারান্দায় কেঁদে ফিরছেন। কে কাকে সান্ত্বনা
দেবে। যাদের সামনের জীবন শুধুই অন্ধকার...ঢাকা
মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বার্ন ইউনিটে বর্তমানে ২১ জন পোড়া রোগী ভর্তি
রয়েছেন। কেউ পাশাপাশি, আবার কেউ নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে। সবাই অসহ্য
যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন...। যখন ড্রেসিং-ব্যান্ডিস খোলা হয়, তখন রোগীদের
চিৎকারে ভারি হয়ে উঠে হাসপাতাল। রোগীদের স্বজনরা জানালেন, অর্থ প্রদান,
সহায়তা দেয়ার নামে ভাঁওতাবাজি চলছে। ক্ষণে ক্ষণে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা আসছে।
বলে যাচ্ছেন সব কিছুই সরকার দেখবে। পুরো চিকিৎসা চালাবে সরকার। তবে অনেকের
অভিযোগ, বেশির ভাগ ওষুধই বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে। পোড়া রোগীদের দেখতে
আসা রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ব্যক্তিদের থেকে শুরু করে সাংবাদিকরা
জুতা পায়ে দিয়েই রোগীদের দেখতে আসছেন। তাতে রোগীদের অবস্থা কখনও কখনও খারাপ
হচ্ছে।বার্ন ইউনিট সার্জন ডা. পার্থ
শঙ্কর পাল জানালেন, কোনো অবস্থাতেই পোড়া রোগীদের অস্বাস্থ্যকর খাবার
খাওয়ানো যাবে না। একই সঙ্গে বাইরে থেকে আসা লোকজনও রোগীদের কাছে ভিড়বে না।
অর্থ প্রতিশ্র“তি বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যেক রোগীকে ১০
হাজার টাকা করে দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, এসব রোগীর চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি হয়।
অনেক অর্থের প্রয়োজন হয়। চিকিৎসাসহ ওষুধপত্র বার্ন ইউনিট থেকেই দেয়া হচ্ছে।
যেসব ওষুধ হাসপাতালে নেই, সেসব ওষুধ রোগীদের স্বজনরা কিনে আনছেন। তিনি
বলেন, বর্তমানে ভর্তি ২১ জন রোগীর মধ্যে ৪ জনের অবস্থা আশংকজনক।