কার্যালয় ছাড়ছেন না খালেদা জিয়া
সরকার সব ধরনের নিরাপত্তা তুলে নিলেও সহসাই গুলশান কার্যালয় ছাড়ছেন না বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। যতদিন অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে ততদিনই অফিসে থাকবেন তিনি। আন্দোলনকে আরও বেগবান ও সক্রিয় করতে এখান থেকেই কর্মসূচির সার্বিক বিষয় মনিটর করবেন খালেদা জিয়া। এ ধরনের পরিকল্পনা থেকেই বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৭৯তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানাতে মাজারে যাননি দলের চেয়ারপারসন। প্রথম থেকেই কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। দিচ্ছেন নানা দিকনির্দেশনা। পরবর্তী করণীয় নিয়ে পরামর্শ করছেন দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গেও। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।গত ৩ জানুয়ারি রাতে গুলশানের কার্যালয় থেকে বেরিয়ে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যেতে চাইলে খালেদা জিয়ার পথ আটকায় পুলিশ। এরপর থেকেই অবরুদ্ধ তিনি। জলকামান ও বালির ট্রাক এনে আটকে দেয়া হয় গুলশানের ৮৬ নম্বর সড়কটি। ১৮ জানুয়ারি দিবাগত রাতে তার অফিসের সামনে থেকে সব ধরনের নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা হয়।বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, গুলশান কার্যালয়ের সামনে থেকে হঠাৎ করে নিরাপত্তা সরিয়ে নেয়া ছিল সরকারের একটি টোপ। নিরাপত্তা ব্যবস্থা তুলে দিলে ১৯ জানুয়ারি জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শেরেবাংলা নগরে শ্রদ্ধা জানাতে যেতে পারেন খালেদা জিয়া। কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পর সেখানে তালা লাগিয়ে নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হতো। যাতে তিনি কার্যালয়ে প্রবেশ করতে না পারেন। বাধ্য হয়েই গুলশানের বাসায় যাবেন। এমন আশংকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা তুলে নেয়ার পরও কার্যালয় না ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন খালেদা জিয়া।গুলশান কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অফিসে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন খালেদা জিয়া। নেতাদের সঙ্গে ফোনালাপের সুযোগ রয়েছে সেখানে। রয়েছে ইন্টারনেট সুবিধাও। দেশের ভেতরে ও বাইরেও যোগাযোগ রাখতে পারছেন। কার্যালয়ে ফ্যাক্স থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফ্যাক্সের মাধ্যমেও অবহিত হচ্ছেন তিনি। সারা দেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অবরোধ পরিস্থিতি সবসময় তাকে অবহিত করছেন চেয়ারপারসনের প্রেসসচিব মারুফ কামাল খান সোহেল ও বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।কিন্তু গুলশানের নিজ বাসায় এসব সুবিধা নেই। গতবছর মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কর্মসূচি ঘোষণার পর নিজ বাসায় অবরুদ্ধ হওয়ার পর কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারেননি তিনি। ফলে কর্মসূচি পালনে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা কোনো দিকনির্দেশনাও পায়নি। এতে গতি পায়নি আন্দোলন।সূত্র জানায়, সরকার চলতি মাসের মধ্যে সংকট উত্তরণের উদ্যোগ না নিলে তীব্র গতিতে আন্দোলন চলবে। এ ক্ষেত্রে ২ ফেব্র“য়ারি অনুষ্ঠেয় মাধ্যমিক পরীক্ষাকে আমলে নিচ্ছে না বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। আন্দোলন বেগবান করার অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগে অবরোধের পাশাপাশি হরতাল দেয়া হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে দ্রুত নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নিতে সরকার সংলাপে বসতে চাইলেই শুধু কর্মসূচি স্থগিত করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এজেন্ডা ছাড়া সংলাপে বসতে চাইলেও তাতে সম্মতি জানাতে পারে দলটি। সে ক্ষেত্রে আন্দোলনও চলবে, কর্মসূচি স্থগিত হবে না।বিএনপি নেতাদের মতে, এভাবে আন্দোলন চালিয়ে যেতে পারলে সরকার আলোচনায় বসতে বাধ্য হবে। ইতিমধ্যে সব স্তর থেকেই সংকট নিরসনে আলোচনায় বসার প্রস্তাব জোরালো হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ ছাড়াও বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোও চলমান সংকট নিরসনে দুপক্ষকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানাচ্ছে। বিএনপিও চাচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব সরকার আলোচনার উদ্যোগ নিক। সবশেষ সোমবার দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও বর্তমান সংকটকে রাজনৈতিক আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে তা নিরসনের উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান সংকট নিরসনে সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। আমরা বারবার সংলাপের আহ্বান জানিয়ে আসছি। সবশেষ সোমবার দলের চেয়ারপারসনও একই দাবি জানান। সরকারকেই এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে।তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দুপক্ষই অনড়। পাশাপাশি একই উচ্চতার দুটি পাহাড় যেমন কেউ কারও কাছে নত হতে চায় না। আমাদের অবস্থাও তাই হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে।গত কয়েকদিনে সারা দেশে যৌথ বাহিনীর অভিযানে সতর্ক চলাচল করতে নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এদিকে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে দলের কয়েকজন নেতা মারা যাওয়ায় অনেকের মাঝে আতংক সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভও বাড়ছে। এ ক্ষোভ থেকে আন্দোলন আরও বেগবান হতে পারে বলেও মনে করছে দলটির হাইকমান্ড।সোমবার সন্ধ্যায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে চলমান আন্দোলন আরও কঠোর করার সিদ্ধান্ত হয়। দেশব্যাপী টানা অবরোধের মধ্যেও আরও কি ধরনের কর্মসূচি দেয়া যায় সে ব্যাপারে মতামত চান খালেদা জিয়া। অবরোধ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি একই সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে বিভাগ বা জেলাভিত্তিক হরতাল দেয়ার পক্ষে বেশিরভাগ নেতা মত দেন। সোমবার রাতেই ঢাকা ও খুলনা বিভাগে টানা ৪৮ ঘণ্টা হরতাল ডাকার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি।বৈঠকে উপস্থিত স্থায়ী কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, চলমান আন্দোলন চালিয়ে যেতে অনড় চেয়ারপারসন। তার কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, এবারের আন্দোলনে একটা ইতিবাচক রেজাল্ট আসবে। বৈঠকের শুরুতেই চলমান আন্দোলনকে আরও কীভাবে গতিশীল করা যায় সে ব্যাপারে মতামত জানতে চান তিনি। আন্দোলনকে সক্রিয় করতে সবাইকে আহ্বান জানান তিনি।সূত্র জানায়, আগামী ফেব্র“য়ারি থেকে শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে এ মুহূর্তে কোনোকিছুই ভাবছে না বিএনপি। আন্দোলন যে পর্যায়ে সেখান থেকে পিছু হটতে চাচ্ছে না তারা। সংকট নিরসনে সরকারকে উদ্যোগ নিতে বাধ্য করা না গেলে ভবিষ্যতে তাদের অস্তিত্ব সংকটে পড়ার আশংকা রয়েছে। সম্প্রতি শেষ হওয়া দুই দফা বিশ্ব ইজতেমা এমনকি ছুটির দিনেও অবরোধ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়নি।জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, দেশে এখন চরম সংকট বিরাজ করছে। গণতন্ত্র থাকবে কিনা এমন আশংকা দেখা দিয়েছে। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে বিএনপি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করছে। আন্দোলন ভবিষ্যতে আরও জোরালো করা হবে। সামনের মাসের শুরুতে অনুষ্ঠিতব্য এসএসসি পরীক্ষার সময় অবরোধ শিথিল করা হবে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেশের মানুষের আজ কোনো নিরাপত্তা নেই। সরকার বিভিন্ন বাহিনী দিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও হত্যা-নির্যাতন করছে। দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দিচ্ছে। সরকারের এমন কর্মকাণ্ড আর হুংকারে সবাই আতংকের মধ্যে আছেন। www.24banglanewspaper.com
