টানা ডিউটিতে ক্লান্ত পুলিশ : হামলায় বাড়ছে আতংক
টানা ডিউটিতে ক্লান্তি ও চোরাগোপ্তা হামলার ভয়ে আতংক দেখা দিয়েছে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে। থানার ওসি, এসআই ও কনস্টেবলদের প্রায় ২৪ ঘণ্টাই ডিউটি করতে হচ্ছে। ব্যারাকের রিজার্ভ পুলিশ সদস্যরাও ডিউটি করছেন ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা। এ জন্য তারা বাড়তি কোনো সুবিধাও পাচ্ছেন না। তারওপর ডিউটির সময় রয়েছে খাবারের সমস্যা, পিকেটারদের ককটেল ও চোরাগুপ্তা হামলার ভয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ২৫ হাজারের বেশি সদস্য বিরামহীন দায়িত্ব পালন করে রাজধানীর পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ অবস্থায় পুলিশ ও গোয়েন্দাদের সবধরনের ছুটি বাতিল এবং কমঝুঁকিপূর্ণ জেলার পুলিশ লাইন থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যদের ঢাকায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজধানীর বেশ কয়েকটি থানার ওসি ও ইন্সপেক্টরের (তদন্ত) সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৩ জানুয়ারির পর থেকে ২৪ ঘণ্টাই তাদের সতর্ক থাকতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় বিশ্রামের সময়টুকুও পাচ্ছেন না তারা। থানার এসআই, এএসআই, হাবিলদার, কনস্টেবলসহ সবাইকে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দিগুণ তিনগুণ ডিউটি করতে হচ্ছে। এরপরও পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হচ্ছে টেলিভিশন, কূটনীতিকপাড়া, মন্ত্রী ও বিচারপতিদের বাড়ির আঙিনা এবং সোনারগাঁও হোটেলের মতো স্পর্শকাতর স্থানে। হাতবোমা ও গুলিভর্তি অস্ত্র পাওয়া গেছে উচ্চ আদালতেও। গোয়েন্দাদের কাছে এ বিষয়ে আগাম তথ্য ছিল না। বিগত আন্দোলনের সময় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরকারকে আগাম তথ্য জানিয়েছে। কিন্তু এবার সংস্থাগুলো আগাম তথ্য দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে রাজধানীতে চোরাগুপ্তা হামলাসহ সহিংসতার ঘটনা বেশি ঘটছে। তারা জানান, উত্তপ্ত পরিস্থিতির সামাল দেয়া ছাড়াও মামলার তদন্ত, টহল, তল্লাশি, আদালতে সাক্ষী দিতে যাওয়া, আসামি ধরা, আসামি আদালতে নিয়ে যাওয়া সবই করতে হচ্ছে তাদের। তারপরও ইন্সপেক্টর থেকে উপরের কর্মকর্তাদের ঝুঁকি ভাতাও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বাড়তি সময়ের জন্য ওভারটাইম দেয়া হচ্ছে না কনস্টেবল ও এসআইদের রাজধানীর রমনা থানার ওসি মশিউর রহমান যুগান্তরকে জানান, থানার ওসিদের ডিউটির নির্ধারিত কোনো সময় নেই। থানা এলাকায় কোনো দুর্ঘটনা কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের খবর পেলেই ওসিদের ছুটে যেতে হয়। তাই ২৪ ঘণ্টাই তাদের ডিউটি। অন্য সময় বিশ্রামের কিছুটা সময় পাওয়া যেত। কিন্তু এখন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্রামের সময়ও পাওয়া যায় না। তাছাড়া থানায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক টহল গাড়ি নেই। রিকুইজিশন করা খোলা ট্রাক নিয়ে ডিউটি করতে হয়। মঙ্গলবার হোটেল রূপসী বাংলার সামনে ডিউটি করছিলেন কনস্টেবল হারুন। দিনে কত ঘণ্টা ডিউটি করতে হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভোর ৫টায় ডিউটিতে আসি। ব্যারাকে ফিরতে রাত ১০টা। রাতে ডিউটি থাকলে বিকাল ৫টায় ডিউটিতে আসি ব্যারাকে ফিরতে ফিরতে সকাল ৯টা ১০টা। এভাবেই চলছে আল্লার ত্রিশ দিন। খাই ব্যারাকের খাবার।’ এই বাড়তি ডিউটির জন্য কোনও ওভারটাইম পান না বলে জানান তিনি।খিলগাঁও পুলিশ ফাঁড়ির কাছে কনস্টেবল ইস্রাফিল জানান, মাঠেই খাওয়া, মাঠেই থাকা। পিকেটারদের হামলা ও ককটেলের ভয়তো আছেই। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল। বাড়িতে মা অসুস্থ। কিন্তু যাওয়ার সময় হয়নি। ছুটি বাতিল করা হয়েছে।পল্টন থানার একজন এএসআই বলেন, দিন-রাত রাস্তার মধ্যেই কাটে। ওপর মহলের যেভাবে নির্দেশ, সেভাবে কাজ করি। খাওয়া-ঘুম কিছুই ঠিকভাবে হয় না। যা খাই, তাকে আর খাবার বলা যাবে না। পুরানাপল্টন মোড়ে দায়িত্বরত নারী কনস্টেবল পাপিয়া জানান, আতংকের পাশাপাশি বড় একটি সমস্যা টয়লেটে যাওয়া। পাবলিক টয়লেটের অপ্রতুলতার কারণে তাদের বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হয়।তবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (ফোর্স) সোহেল আহমদ ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পুলিশ ডিউটি করার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, পুলিশের ডিউটি সকাল-সন্ধ্যা। ভোরে যে পুলিশ ডিউটি শুরু করে সন্ধ্যায় তারা শেষ করে। সন্ধ্যায় শুরু করে ভোরে শেষ করে। সংশ্লিষ্ট ইউনিটের চাহিদার আলোকে রিজার্ভ পুলিশ পাঠানো হয়।পুলিশের বাড়তি ডিউটি প্রসঙ্গে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা ক্লান্ত হইনি। আমরা ক্লান্ত হয়েছি এ কথা যদি কেউ আপনাকে বলে থাকে তাহলে ভুল বলেছে। আমরা প্রশিক্ষিত পেশাদার ফোর্স। আমাদের মধ্যে দেশপ্রেম আছে। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, দেশের প্রয়োজনে এক মাস, এক বছর বা দুই বছর নয়; টানা ১০ বছরও ডিউটি করতে রাজি আছি। ক্লান্তি বা আতংক আমাদের স্পর্শ করবে না।’www.24banglanewspaper.com
