খিলগাঁওয়ে বন্দুকযুদ্ধে ছাত্রদল নেতা জনি নিহত
রাজধানীতে
গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন খিলগাঁও থানা
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নূরুজ্জামান জনি (৩০)। মঙ্গলবার ভোররাতে খিলগাঁও
রেলগেট জোড়াপুকুরপাড় এলাকায় এ বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। পুলিশ বলেছে,
নূরুজ্জামান জনি শনিবার রাতে মৎস্য ভবন এলাকায় পুলিশের বাসে পেট্রলবোমা
হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন আসামি। মঙ্গলবার বিকালে তাকে আটকের পর গোয়েন্দা
পুলিশের একটি দল ভোর ৩টার দিকে ওই এলাকায় অভিযানে গেলে দুর্বৃত্তরা পুলিশকে
লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এ সময় আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি ছুড়লে জনি
আহত হন। পরে তাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে
চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। সুরতহাল রিপোর্টে ছাত্রদল নেতার বুক, পিঠসহ
বিভিন্ন স্থানে মোট ১৬টি গুলি বিদ্ধ হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে পুলিশ।
এদিকে
বন্দুকযুদ্ধের পর ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, দুটি গুলি, ছয়টি হাতবোমা ও
একটি পেট্রলবোমা উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ দাবি করেছে। তবে নিহত ছাত্রদল
নেতা নূরুজ্জামান জনির বাবা বৃদ্ধ ইয়াকুব আলী বলেছেন, ‘তার ছেলের বিরুদ্ধে
মামলা তো দূরের কথা একটি জিডি পর্যন্ত নেই। তার ছেলের একটাই দোষ সে বিএনপি
করে।’ এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব
অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।মঙ্গলবার
সকালে রাজধানীর খিলগাঁও জোড়াপুকুর খেলার মাঠের দক্ষিণ পাশে সরেজমিন গিয়ে
দেখা গেছে ঘটনাস্থলে ছোপ-ছোপ রক্তের দাগ। এর মধ্যে পড়ে রয়েছে কয়েকটি গুলির
খোসা। শার্টের কয়েকটি বোতামও পড়ে রয়েছে ঘটনাস্থলে। রাস্তার ওপর গুলির
চিহ্নও দেখা যায়। ঘটনাস্থল ঘিরে রেখেছে পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা। স্থানীয়
লোকজনের সঙ্গে কথা বলে মঙ্গলবার ভোরে কথিত ওই বন্দুকযুদ্ধের সময় এক
প্রত্যক্ষদর্শীর সন্ধান মেলে। শফিক (ছদ্মনাম) নামে ১৩-১৪ বছরের এক শিশু
ঘটনার সময় ওই এলাকায় কাগজ কুড়াচ্ছিল। ওই কিশোর যুগান্তরকে জানায়, ‘আমি
ময়লার মধ্য থেকে কাগজ কুড়াই। সে জানায়, ‘রাত ৩টার দিকে একটা সাদা
প্রাইভেটকার জোড়াপুকুর খেলার মাঠের পাশে এসে দাঁড়ায়। ওই প্রাইভেট কার থেকে
সাদা পোশাকে তিনজন লোক নেমে আসে। তাদের একজন আমাকে ধমক দিয়ে এত রাতে কি
করছি জানতে চাইলে আমি জানাই, কাগজ টোকাচ্ছি।’ এরপর ওই ব্যক্তি এখানে থাকলে
সমস্যা হবে জানিয়ে দ্রুত চলে যেতে বলে। শফিক জানায়, এরপর সে জোড়াপুকুরের
পশ্চিম দিকে গলির ভেতর চলে যায়। এ সময় সেখানে কালো রংয়ের একটি পাজেরো গাড়ি
এসে থামে। এর কয়েক মিনিটের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়। শফিক জানায়, ভয় পেয়ে সে
দৌড়ে গলির ভেতর চলে যায়। প্রায় ২০-২৫ মিনিট পর অনেক লোক ঘটনাস্থলে জড়ো হন।
তখন সেও সেখানে এসে সাদা শার্ট পরা এক ব্যক্তিকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে
থাকতে দেখে। পরে পুলিশ ও র্যাবের কয়েকটি গাড়ি ঘটনাস্থলে এসে সবাইকে সেখান
থেকে সরিয়ে দেয়। পরে ভোর ৪টার দিকে পুলিশ রক্তাক্ত ওই ব্যক্তিকে পুলিশের
গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যায়।এ ব্যাপারে
জানতে চাইলে খিলগাঁও থানার ডিউটি অফিসার এসআই ইফতেখার যুগান্তরকে জানান,
‘বন্দুকযুদ্ধে একজন নিহত হয়েছে বলে শুনেছি। এর চেয়ে বেশি কোনো তথ্য আমার
কাছে নেই।’ ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন,
‘অফিসের বাইরে কি ঘটেছে তা আমি কিভাবে জানব। সেটা বলতে পারবে আমাদের পেট্রল
টিম। পেট্রল টিম এখনও আমাকে কোনো তথ্য দেয়নি।’ঢাকা
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (দক্ষিণ) উপ-কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় জানান, জনি
ছাত্রদল নেতা বলে জানা গেছে। রাজধানীর মৎস্য ভবনের সামনে পুলিশের ওপর বোমা
হামলার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। সোমবার নাজিমউদ্দিন রোড থেকে গোয়েন্দা পুলিশ
জনিকে আটক করে। এরপর রাত আড়াইটার দিকে তাকে নিয়ে জোড়াপুকুর বালুর মাঠে
অভিযানে গেলে দুর্বৃত্তরা গোয়েন্দা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ও ককটেল
নিক্ষেপ করলে বন্দুকযুদ্ধ হয়।জনির
বাবার ভাষ্য : জনির বাবা ইয়াকুব আলী জানান, শুক্রবার তার বড় ছেলে
নুরুজ্জামান জনিকে গ্রেফতারের জন্য গোয়েন্দা পুলিশ গোড়ান এলাকায় তার সিএনজি
গ্যারেজে অভিযান চালায়। কিন্তু ওই সময় জনি গ্যারেজে না থাকায় তার ছোট ভাই
মনিরুজ্জামান হীরাকে ধরে নিয়ে যায়। ইয়াকুব আলী বলেন, ছোট ছেলে কোনো
রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না থাকলেও পরদিন পুলিশ তাকে খিলগাঁও থানার একটি গাড়ি
পোড়ানো মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠায়।কান্নাজড়িত
কণ্ঠে ইয়াকুব আলী জানান, সোমবার দুপুর ১টার দিকে জনি তার বন্ধু মইনসহ ৩-৪
জন তার ছোট ভাই হীরাকে দেখতে জেলখানায় যায়। ছোট ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে
ফেরার পথে একটি সাদা রংয়ের প্রাইভেট কার থেকে ২-৩ জন লোক নেমে গোয়েন্দা
পুলিশ পরিচয়ে জনি এবং মইনকে আটক করে। রোববার মইনকে খিলগাঁও থানা পুলিশের
কাছে হস্তান্তর করা হলেও গোয়েন্দা পুলিশ জনিকে মিন্টো রোডের কার্যালয়ে আটকে
রাখে।ইয়াকুব আলী বলেন, খবর পেয়ে ওই
রাতেই তারা গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে ছুটে যান। বারবার জনির অবস্থান
জানার চেষ্টা করেন। কিন্তু কেউ কোনো কথা বলেনি। মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে
খিলগাঁও থানা থেকে ফোন করে ক্রসফায়ারে জনি মারা গেছে বলে জানানো হয়। পরে
তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান। এ সময় হাসপাতালের মর্গে ছেলের
নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার করে কান্নায় ভেঙে পড়েন জনির মা মরিয়ম বেগম।
তার আহাজারিতে এ সময় মর্গের বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। ছাত্রদল নেতা জনি মাত্র
দেড় বছর আগে বিয়ে করেন মনিয়া পারভীন মনীষা নামে এক তরুণীকে। মনিয়া এখন ৭
মাসের অন্তঃসত্ত্বা বলে জানিয়েছেন জনির চাচা ইলিয়াস মিয়া।নিহত
নূরুজ্জামান জনি ২ ভাই ১ বোনের মধ্যে বড় ছিলেন। তাদের বাসা খিলগাঁওয়ের
২০১/১ তিলপাপাড়ায়। সম্প্রতি তিলপাপাড়ার টিনশেড বাড়ি ভেঙে সেখানে ভবন
নির্মাণের কাজ চলছে। বর্তমানে তারা দক্ষিণ গোড়ানের শান্তিপুর ৫ নম্বর গলিতে
৬ তলা ভবনের তিন তলায় ভাড়া থাকেন।মঙ্গলবার
দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ
সাদিয়া তাজনিনের উপস্থিতিতে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করেন খিলগাঁও থানার এসআই
আলাউদ্দিন। সুরতহাল রিপোর্টে তিনি নূরুজ্জামান জনির বাম কোমরে ১টি, বুকের
মাঝে ৩টি, বুকের বাম পাশে ২টি, ডান পাশে ৩টি, পিঠের বাম পাশে ২টি, পিঠের
বাম পাশে ওপরে ২টি, ডান পাশে ১টি এবং ঘাড়ের বাম পাশে একটি গুলিসহ মোট ১৬টি
গুলি বিদ্ধ হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। মঙ্গলবার বিকালে ময়নাতদন্ত শেষে জনির
লাশ গ্রহণ করেন তার চাচা ইলিয়াস মিয়া। দক্ষিণ গোড়ানে জানাজা শেষে স্থানীয়
কবরস্থানে জনিকে দাফন করা হবে বলে তিনি জানান।এর
আগের রাতে মতিঝিল এজিবি কলোনির কাঁচাবাজার এলাকায় গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে
কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন জামায়াত নেতা ও নড়াইল পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের
কাউন্সিলর ইমরুল কায়েস (৩৮)। পুলিশের গ্রেফতার এড়াতে তিনি দীর্ঘদিন আগে
এলাকা থেকে পালিয়ে রাজধানীতে আত্মগোপন করেছিলেন বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে
দাবি করা হয়।www.24banglanewspaper.com
