বড়
দুই জোটের রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে ১৪ লাখ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী।
এসএসসি পরীক্ষা সামনে রেখে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল এবং বিএনপির
নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে। সরকার পক্ষের
আশা,
ভোটের প্রত্যাশায় হলেও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট পরীক্ষার সময়
অবরোধসহ জ্বালাও-পোড়াও বন্ধ করবে। তা না করলে তরুণ প্রজন্মসহ জনগণের
বিরাগভাজন হবে বিএনপি। অপরদিকে বিরোধী পক্ষ ভাবছে,
পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে
অনুষ্ঠানের দায়িত্ব সরকারের। তাই পরীক্ষার প্রয়োজনে হলেও সরকার পক্ষ ছাড়
দিয়ে সমঝোতায় আসবে। অন্যথায় সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা গ্রহণে ব্যর্থতার কালিমা
সরকারের গায়ে লাগবে। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে
আলাপে এ তথ্য জানা গেছে।
এর আগে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতেমা নিয়েও একই
ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। সরকার ভেবেছিল ধর্মপ্রাণ মানুষের কথা
বিবেচনা করে ইজতেমার সময় অবরোধ প্রত্যাহার করে নেবে ২০ দলীয় জোট। আর
বিরোধীরা ভেবেছিল সরকার নিজের দায় থেকেই সমঝোতায় আসবে। কিন্তু বাস্তবে
কিছুই হয়নি। অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রাখে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট।
ঝুঁকি নিয়ে অনেকেই ইজতেমায় যোগ দিয়েছেন। আবার ইচ্ছা থাকার পরও অনেকেই আসতে
পারেননি। কিন্তু মাধ্যমিক পরীক্ষার বিষয়টি একজন শিক্ষার্থীর জন্য
বাধ্যতামূলক। তাকে নির্ধারিত দিনে নির্দিষ্ট পরীক্ষা দিতেই হবে। অবরোধের
কারণে কেন্দ্রে আসতে না পারলে শিক্ষার্থীর জীবন থেকে একটি বছর হারিয়ে যাবে।
১৪ লাখ পরীক্ষার্থী এবং তাদের লাখ লাখ অভিভাবক এ আশংকার মধ্যেই সময় পার
করছেন।দুই জোটের নেতাদের এ ধরনের
মানসিকতার মধ্যে আগামী ২ ফেব্রুয়ারি এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। পরিস্থিতি
যাই হোক পরীক্ষা পেছাবে না। তবে হরতাল দেয়া হলে ওই দিনের পরীক্ষা পিছিয়ে
যাবে। দুই ফেব্র“য়ারি অনুষ্ঠেয় পরীক্ষায় এবার এসএসসি, দাখিল ও এসএসসি
ভোকেশনালসহ প্রায় ১৪ লাখ ছাত্রছাত্রীর অংশ নেয়ার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা
জানিয়েছেন, বর্তমানে পরীক্ষার্থীদের মডেল টেস্টসহ শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি
নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা। কিন্তু পূর্ণ মনোসংযোগের সঙ্গে শেষ মুহূর্তের
প্রস্তুতি নিতে পারছে না পরীক্ষার্থীরা। দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে
তারা আদৌ পরীক্ষা দিতে পারবে কিনা এ চিন্তায় তাদের মনোসংযোগ ব্যাহত হচ্ছে। এ
ছাড়া উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যে শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে গিয়ে
নিরাপদে পরীক্ষা দিতে পারবে কিনা- সেই দুশ্চিন্তায় সময় পার করছেন
অভিভাবকরা। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জানিয়েছেন, এ পরিস্থিতিতে তাদের মধ্যে
আতংক বিরাজ করছে। স্বাভাবিক লেখাপড়া ও প্রস্তুতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত
হচ্ছে। এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে না দিতে আওয়ামী লীগ-বিএনপি
উভয় পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ১৪ লাখ পরীক্ষার্থীর লাখ লাখ অভিভাবক,
আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাক্সক্ষীরা।সহিংস
পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে পরীক্ষায়
বসার ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য সরকারি এবং বিরোধী উভয় পক্ষকেই তাগিদ দিয়েছেন
দেশের সিনিয়র নাগরিক প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
তিনি বলেন, যেহেতু চলমান পরিস্থিতির কারণে সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা নেয়া বিঘিœত
হতে পারে, তাই দ্রুত এ পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে হবে। এ জন্য তিনি সরকারকে
এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এ দায়িত্ব ১৪ দল এবং ২০ দলীয় জোটের
হলেও, এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বই বেশি। কেননা, দুই পক্ষের মধ্যে বেশি
শক্তিশালী সরকার। তা ছাড়া তারা সরকারে রয়েছে। এই দুই কারণেই সরকারি মহলকে
ছাড় দিতে হবে। সমঝোতার উদ্যোগ নিতে হবে। এগিয়ে যেতে হবে।শিক্ষা
মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের যাই
হোক এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ীই পরীক্ষা নেয়ার
জন্য প্রস্তুত। এ জন্য ইতিমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র
মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা কেন্দ্রে
যাওয়া-আসার পথে নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়,
পরীক্ষা শেষে ৬০ দিনের মধ্যে ফলাফল প্রকাশের লক্ষ্যে উত্তরপত্র মূল্যায়নের
ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। এ জন্য রেলপথ এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের
দুই সচিবকে পৃথক পত্র পাঠানো হয়েছে। এতে কেন্দ্র থেকে পরীক্ষার দিনই
উত্তরপত্র এবং ওএমআর ফরমসহ গোপনীয় কাগজপত্র শিক্ষা বোর্ডগুলোতে যাতে পাঠানো
যায়, সে জন্য এগুলো ডাকঘরে বা রেলস্টেশনে না পৌঁছা পর্যন্ত অফিস খোলা
রাখা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্টদের বলা
হয়েছে।শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র
জানায়, এর বাইরে শিক্ষাসচিব নজরুল ইসলাম খান নিজে সব উপজেলা নির্বাহী
কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারকে (এসপি) আলাদা
পত্র দিয়েছেন। এতে উত্তরপত্রসহ পরীক্ষার সরঞ্জামাদির নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ ৮
দফা নির্দেশনা রয়েছে।ঢাকার
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের স্বার্থ নিয়ে আন্দোলনকারী সংগঠন অভিভাবক
ফোরামর চেয়ারম্যান জিয়াউল কবীর দুলু বলেন, চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে
বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু সরকার যদি
এসএসসি পরীক্ষা নেয়, তাহলে সব উপেক্ষা করে হলেও যেতে হবে। কিন্তু আমরা গত
কদিনে যে চিত্র দেখেছি, তাতে সন্তান নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়ার চিন্তা করতেই
গা শিউরে ওঠে। আমাদের আহ্বান- রাজনীতিবিদরা আমাদের সন্তানদের ঝুঁকির মধ্যে
ঠেলে দেবেন না।ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও পরীক্ষা বিষয়ে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটির
আহ্বায়ক ড. শ্রীকান্ত কুমার চন্দ বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা নির্ধারিত সময়সূচি
অনুযায়ীই পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্তে আছি। পরীক্ষা শুরু হতে এখনও ১০-১২ দিন
বাকি। আশা করছি, ১৪ লাখ ছাত্রছাত্রীর কথা বিবেচনায় নিয়ে এ সময়ের মধ্যেই
সংশ্লিষ্টরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবেন। এরপরও যদি পরিস্থিতি
স্বাভাবিক না হয় সে ক্ষেত্রে কীভাবে পরীক্ষা চলবে- এমন এক প্রশ্নের জবাবে
তিনি বলেন, ইতিপূর্বে পরীক্ষাগুলোতে সাধারণত হরতালের আগের দিন সিদ্ধান্ত
জানানো হতো। এবারও হয়তো সিদ্ধান্ত সে রকম সময়ে জানা যাবে।যথাসময়ে
পরীক্ষা অনুষ্ঠানের কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুও মঙ্গলবার সচিবালয়ে পরীক্ষা অনুষ্ঠানের কথা
জানানোর পাশাপাশি এ সময়ে সব ধরনের কর্মসূচি বন্ধ রাখার জন্য সব রাজনৈতিক
দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন কর্মসূচি বন্ধ করা না হলে প্রশাসন
সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করবে।শিক্ষামন্ত্রী
নুরুল ইসলাম নাহিদ যুগান্তরকে বলেন, যে ১৪ লাখ ছাত্রছাত্রী মাধ্যমিক
পরীক্ষা দিচ্ছে, তারা সবাই আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান নয়। এদের সবাই এ
দেশেরই নাগরিক। তারা দেশের ভবিষ্যৎ। তাই এ সময়ে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের
অবরোধসহ সহিংস কর্মসূচি দেয়া ঠিক হবে না। আমরা আহ্বান জানাব, শিক্ষার্থীদের
কথা বিবেচনা করে হলেও তারা কর্মসূচি থেকে বিরত থাকবেন। বিরোধী পক্ষ যাতে
কর্মসূচি থেকে ফিরে যায় সে জন্য কোনো পদক্ষেপ নেবেন কিনা- এমন প্রশ্নের
জবাবে তিনি বলেন, পরীক্ষার এই সময়সূচি ৬ বছর আগে নির্ধারণ করা। তাদের উচিত
ছিল এ সময়ে এ ধরনের কর্মসূচি না রাখা। তিনি স্বীকার করেন, বিরোধী পক্ষের
কর্মসূচির কারণে মানুষ ভয়ে কম বের হচ্ছে বা গাড়ি বের করছে না।আর
এ ব্যাপারে বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল কবীর খোকন বলেন, আজকের এ
পরিস্থিতির জন্য বিএনপি দায়ী নয়, সরকারই এ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়েছে। এ
পরিস্থিতি দূর করার দায়িত্বও তাদেরই। তিনি বলেন, সরকার জনগণকে ঘরে থাকতে
দিচ্ছে না। তারা ঘরে থাকতে না পেরে মাঠে-রাস্তাঘাটে ঘুমাতে গেলে সেখানেও
হামলা চালানো হচ্ছে। ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় বের হলে তাদের ধরে নিয়ে
জেলখানায় পাঠাচ্ছে, মানুষ ধরে খুন করছে- সেখানে লেখাপড়ার পরিবেশ কোথায়?
আমরা ছাত্রছাত্রীদের জিম্মি করছি না, করতে চাই না। লেখাপড়ার সুষ্ঠু পরিবেশ
তথা দেশ, গণতন্ত্র ও জীবন-জীবিকার প্রশ্নে আমরা আন্দোলন করছি। গণতন্ত্র
ফিরিয়ে আনতে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের পদক্ষেপ না নেয়া পর্যন্ত ঘোষিত
কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।দুই পক্ষের
এই অনড় অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, দুই
পক্ষকেই সমঝোতায় গিয়ে পরীক্ষার্থীদের সুষ্ঠু পরিবেশ দিতে হবে। আইনশৃংখলা
বাহিনীর মাধ্যমে পরীক্ষা অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
দুপক্ষের অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে তারা চরম পরীক্ষায় নেমেছে। এটা যুদ্ধ না
যে এখানে হার-জিত থাকবে। রাজনীতিতে ছাড় দেয়ার বিষয়টি রাজনীতিরই অংশ।
রাজনৈতিক সংকট প্রশাসনিকভাবে সমাধান সম্ভব নয়, এর জন্য রাজনৈতিক সমাধানে
যেতে হবে।www.24banglanewspaper.com

