শিরোনাম
Loading...

news review 1

reveunis 2

Phone-Video

মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০১৫

হরতাল বন্ধের আইন সংবিধানবিরোধী


আইন দিয়ে হরতাল-অবরোধ বন্ধ করা সংবিধানসম্মত হবে না। এ ধরনের আইন হলে জনগণের মৌলিক অধিকার খর্ব হবে। মানুষের অধিকার পরিপন্থী আইন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। উচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী হরতাল-অবরোধ চলতে পারে। তবে এ ধরনের কর্মসূচির নামে মানুষ হত্যা, জ্বালাও-পোড়াও, ভাংচুরসহ জানমালের ক্ষতি করা যাবে না। কিন্তু কিছুই থেমে নেই। হরতাল-অবরোধের সময় ভাংচুর, জ্বালাও-পোড়াও অব্যাহত আছে। এ অবস্থায় কেউ হরতাল বন্ধ করতে চায়। আবার কেউ হরতাল-অবরোধের বিকল্প কর্মসূচি নিয়েও চিন্তাভাবনা করছেন বলে জানা গেছে। এ প্রসঙ্গে সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ড. কামাল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আইন করে হরতাল-অবরোধ বন্ধের উদ্যোগ নেয়া হলে তা হবে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং মৌলিক অধিকার পরিপন্থী। তিনি বলেন, এ দেশ কোনো ব্যক্তি, দল বা পরিবারের নয়। দেশের মালিক ষোলো কোটি জনগণ। কারও ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর ভিত্তি করে দেশ চলতে পারে না। ড. কামাল হোসেন বলেন, হরতাল-অবরোধসহ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের অধিকার সবার আছে। কিন্তু এ কর্মসূচি পালনের আড়ালে হত্যাযজ্ঞ, জ্বালাও-পোড়াও-ভাংচুর-সহিসংতা এবং জনমনে ভীতি সৃষ্টির অধিকার কারোর নেই। কেউ এসব করলে প্রচলিত আইনেই এর বিচার সম্ভব। এ জন্য নতুন কোনো আইনের প্রয়োজন নেই।দেশের অন্যতম শীর্ষ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক উল হক সোমবার এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, হরতাল করা যাবে। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা আছে। তবে হরতালের নামে মানুষ হত্যা, জ্বালাও-পোড়াও, ভাংচুরসহ জানমালের ক্ষতি করা যাবে না। যারা এটি করবেন তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ারও নির্দেশনা আছে উচ্চ আদালতের। তিনি আরও বলেন, আইন করে হরতাল-অবরোধ বন্ধ করা হলে তা হবে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও মৌলিক অধিকার পরিপন্থী। বর্তমানে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ডাকে দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ও বিভিন্ন জেলায় স্থানীয়ভাবে হরতাল পালিত হচ্ছে। এতে প্রায় প্রতিদিন গাড়িতে আগুন, ভাংচুর, মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। যানবাহন চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় আমদানি-রফতানি খাতে এক ধরনের বন্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলো হরতাল-অবরোধ বন্ধের দাবি জানিয়েছে। প্রয়োজনে এ ইস্যুতে তারা আইনের আশ্রয় নেয়ার জন্য আদালতের শরণাপন্ন হতে চেয়েছে। খোদ শাসক দল আওয়ামী লীগের ভেতর থেকেই আইন করে হরতাল-অবরোধ বন্ধের বিষয়টি নতুন করে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। দলটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সম্প্রতি হরতাল-অবরোধ বন্ধে প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়নের কথা জানিয়েছেন। জাতীয় সংসদে এ সংক্রান্ত একটি বিলও পাসের অপেক্ষায় আছে। প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি প্রথম থেকেই আইন করে হরতাল-অবরোধ বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে। শুধু হরতাল-অবরোধ বন্ধের বিরুদ্ধে বিএনপি। এ ছাড়া গণফোরাম, সিপিবি, বাসদ, বিকল্প ধারা, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বাম এবং প্রগতিশীল ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোও হরতাল-অবরোধ বন্ধের বিপক্ষে। তবে তারা হরতাল-অবরোধের নামে সহিংসতাও বন্ধের পক্ষে।সংবিধানে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠনকে সভা-সমাবেশ করার অধিকার দেয়া আছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ থেকে ৪৭ অনুচ্ছেদ পর্যন্ত বিভিন্ন ধারা ও উপধারায় জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা, ইহার যে কোন স্থানে বসবাস ও বসতিস্থাপন এবং বাংলাদেশ ত্যাগ ও বাংলাদেশে পুনঃপ্রবেশ করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।অনুচ্ছেদ ৩৭-এ বলা হয়েছে, জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, আইন করে হরতাল-অবরোধ বন্ধ করা মানে দেশেকে জরুরি অবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়া। তিনি বলেন, হরতাল-অবরোধের নামে ভাংচুর-জ্বালাও-পোড়াও-বোমা নিক্ষেপসহ বিভিন্ন অপরাধের বিচারের জন্য দেশে অনেক আইন রয়েছে। এসব আইনেই বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তাই আর নতুন করে আইন করা হলে শুধু হরতাল-অবরোধ ডাকা যাবে না- এমন আইন করতে হবে। এ ধরনের আইন করার অর্থ হচ্ছে- সেই বিশেষ ক্ষমতা আইনে ফিরে যাওয়া। যা কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না।প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এমপি এ প্রসঙ্গে সোমবার যুগান্তরকে বলেন, আইন করে হরতাল-অবরোধ নিষিদ্ধ করতে হবে। ঔপনিবেশিক আমলের হরতাল-অবরোধ একবিংশ শতকে এসে চলতে পারে না। উন্নয়ন ও অগ্রগতির স্বার্থেই এখন হরতাল-অবরোধের বিকল্প কর্মসূচি নিয়ে ভাববার সময় এসেছে।এর আগে গত বছর ৯ সেপ্টেম্বর দশম জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জনগণ চাইলে এবং সংসদ সদস্যরা একমত হলে আইন করে হরতাল বন্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এ সময় তিনি আরও বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আন্দোলন করার অধিকার সবার আছে। কিন্তু হরতাল কোনো আন্দোলন হতে পারে না। হরতালের নামে বিভৎসতা চলতে পারে না।আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিকরাও হরতাল-অবরোধ বন্ধে নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে দাবি করেছে। এ প্রসঙ্গে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এমপি যুগান্তরকে বলেন, হরতাল-অবরোধের নামে হত্যা-ধ্বংস-নৈরাজ্য-জ্বালাও-পোড়াও চলতে দেয়া যায় না।যদিও বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিকরা অবশ্য এর বিরুদ্ধে। তাদের মতে, সরকার ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় এবং বিরোধী দলের আন্দোলনে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে হরতাল-অবরোধ বন্ধে নতুন আইন প্রণয়নের কথা ভাবছে।এ প্রসঙ্গে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন সোমবার যুগান্তরকে বলেন, হরতাল-অবরোধ গণতান্ত্রিক অধিকার। এ অধিকার সংবিধান স্বীকৃত। হরতাল-অবরোধ বন্ধ করে সরকার একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র বানাতে চায়।হরতাল ও অবরোধের কারণে এক ধরনের দমবন্ধ অবস্থা থেকে উত্তরণে নবম জাতীয় সংসদের প্রথম দিকে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু লাগাতার হরতালকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে জনস্বার্থ বিল-২০১০ নামে একটি বেসরকারি বিল জমা দেন। পরে জাতীয় সংসদের বেসরকারি সদস্যদের বিল ও সিদ্ধান্ত প্রস্তাবসম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বিলটি যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে বিলটি আর পাসের জন্য সংসদে উত্থাপিত হয়নি।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারও তাদের শরিকরা হরতাল-অবরোধ বন্ধের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলে বিলটি দশম জাতীয় সংসদের আসন্ন অধিবেশনে নতুন করে উঠতে পারে। মুজিবুল হক চুন্নুর জমা দেয়া আগের সংসদের বিলটি তামাদি হয়ে যাওয়ায় সে ক্ষেত্রে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে অন্য যেকোনো একজন সংসদ সদস্য বিলটি নতুন করে জমা দিতে পারেন। সরকারি দল আওয়ামী লীগ বা তাদের শরিক কোনো দলের পক্ষ থেকেও এমন একটি বিল আনা হতে পারে।এ প্রসঙ্গে সাবেক আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু যুগান্তরকে বলেন, এখন সময় এসেছে হরতালের বিকল্প উপায় খুঁজে বের করার। যদিও এতে সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, আইন করে হরতাল-অবরোধ বন্ধ করলে কোনো লাভ হবে না। আর এতে সমস্যার সমাধান হবে না বরং আরও বাড়বে। তাই সমস্যার গভীরে যেতে হবে। এরপর তা চিহ্নিত করে প্রতিকারের উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু সরকার সে উদ্যোগ না নিয়ে অযথা প্রলেপ দিয়ে সব ঢাকতে চাইছে।www.24banglanewspaper.com

Related Post:

  • 0Blogger Comment
  • Facebook Comment

pop Earnings