২০১৪ সালের শেষ, জাতীয় নির্বাচন এবং সরকার গঠনের এক বছর- এই তিনটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা প্রায় একই সময়ে পড়েছে। সুতরাং এক বছরের অর্জন এবং হতাশা-ব্যর্থতার কথা আলাপ করলে তিনটি বিষয়েই বলা হবে। যে কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা দেশের জীবনে এক বছর বা ৩৬৫ দিনে অনেক কিছুই ঘটে। এতে সফলতা কিংবা ব্যর্থতা- দুটি বিষয়ই থাকে। আমরা সরকারই বলি বা দেশই বলি, দেখা যাবে গত এক বছরে কিছু অর্জন আছে। কিছু ভালো কাজ হয়েছে, যেটা সরকারের সাফল্যগাথার মধ্যে যাবে। আবার অনেক হতাশা, ব্যর্থতা ও দুঃখজনক ঘটনাও ঘটেছে। যেগুলো সরকারের জন্য বিব্রতকর হয়েছে। ভবিষ্যতেও সরকারকে এই বিষয়গুলোর ব্যাপারে নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। সফলতা নিয়ে আলোচনা করলে প্রথমেই ধরতে হবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন। এই নির্বাচনকে দু’ভাবে দেখতে হবে। শাসক দল মনে করে, দেশে একটা নির্বাচন হয়েছে এবং তা একটা চ্যালেঞ্জের মুখে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিরোধী দল বলেছিল, তারা নির্বাচন প্রতিহত করবে। নির্বাচনকে বড়ভাবে বাধাগ্রস্ত করবে। আর শাসক দল মনে করে, সে রকম কোনো বাধা তৎকালীন বিরোধী দল সৃষ্টি করতে পারেনি। নির্বাচন হয়ে গেছে এবং সেই নির্বাচনের মাধ্যমে তারা সরকার গঠন করেছে। তবে নির্বাচনটি কিন্তু একেবারে প্রশ্নাতীত হয়নি। এ নির্বাচনের পক্ষে-বিপক্ষে নানা বক্তব্য আছে। বিশেষ করে বিপক্ষে বড় রকমের বক্তব্য হচ্ছে দেশের প্রায় ৫২ শতাংশ ভোটার নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি। এমনকি দেশের রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ বড় বড় রাজনৈতিক নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও ঠিকমতো ভোট দিতে পারেননি বা ভোট দেননি। ১৫৪টি আসনে বিনা ভোটে প্রার্থীরা এমপি হিসেবে ঘোষিত হয়েছেন। তাদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। এদিক থেকে পার্লামেন্ট গঠনে একটা বিরাট দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে। সংসদের অধিকাংশ সদস্যই বিনা ভোটে পার্লামেন্টে বসার সুযোগ পেয়েছেন। শাসক দলকে এই অভিযোগ সারা জীবন হয়তো বয়ে বেড়াতে হবে। কিন্তু এর ভিত্তিতে শাসক দল প্রশাসনিক দিক দিয়ে সুবিধা পেয়েছে এবং এদিক থেকে সরকার প্রশ্নাতীত অবস্থায় রয়েছে। কারণ রাষ্ট্রের সব প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান সরকারের প্রতি বিনা প্রতিবাদে আনুগত্য প্রকাশ করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মোটামুটিভাবে বিশ্বও সরকারকে কাজ চালানোর মতো স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু মূল বিষয়টি থেকে যাওয়ার কারণে অর্থাৎ গণতান্ত্রিক অধিকার বা ভোট দেয়ার অধিকার হারানোর যে অভিযোগ, এটা কিন্তু সারা বছরই সরকারকে তাড়া করে ফিরেছে; অস্বস্তিতে রেখেছে। নির্বাচনের পর এমন একটি দিন যায়নি যে, কোনো না কোনো মাধ্যমে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে প্রশ্ন করা হয়নি। অর্থাৎ এ বিষয়টি কিন্তু হারিয়ে যায়নি। বছর শেষে এ বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। বছরের শেষ সপ্তাহটিও হরতালের মধ্য দিয়ে কেটেছে। বিগত বছরের বাকি সময়টুকু মোটামুটি নির্ঝঞ্ঝাট ও শান্তিপূর্ণভাবেই অতিবাহিত হয়েছে।যদিও এ সময়ের মধ্যে সরকারের জন্য অনেক বিব্রতকর ঘটনা ঘটেছে। আর তা ঘটেছে নিজের দলের লোকজনের মাধ্যমেই। একে রাজনৈতিক ভাষায় বলা যায় দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। মূল দলের উচ্চপর্যায়ের নেতা-নেত্রীদের বক্তব্য ও আচার-আচরণের কারণে সরকারের জন্য বিরাট সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। এমনকি একজন মন্ত্রীকে শুধু দল ও মন্ত্রিসভা থেকেই বহিষ্কার নয়, বিরূপ মন্তব্যের কারণে জেলেও পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশে বোধহয় এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম। নিজ সরকার ক্ষমতা থাকাবস্থায় আগে কোনো মন্ত্রী জেলে গেছেন বলে আমার জানা নেই।এছাড়াও শাসক দলের অঙ্গসংগঠনগুলো সরকারকে অসুবিধার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের মারামারি, সংঘর্ষ ও সংঘাতে প্রাণহানির অনেক ঘটনা ঘটেছে। আর বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের সশস্ত্র তাণ্ডবে শুধু যে প্রাণহানি ঘটেছে তা নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। বস্তুত আজকে দেশের উচ্চশিক্ষা চরম বিপর্যয়ের মুখে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষায় দুর্নীতি, শিক্ষামানের অবনতি শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের গত পাঁচ-ছয় বছরের সব অর্জন ম্লান করে দিয়েছে। আজকে বাংলাদেশের শিক্ষার মান নিয়ে শাসক দলের মন্ত্রী-এমপি, নেতা ও নিজস্ব ঘরানার লোকদের মধ্যেও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। এসবের মধ্যেও সরকার ঠিক সময়ে বিনামূল্যের বই দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। এটি একটি সরকারের বড় সফলতা। যদিও শিক্ষা ব্যবস্থায় এর গুরুত্ব সমধিক নয়। কারণ পাঠ্যবই মোটামুটি জানুয়ারি মাসের মধ্যেই ভালোভাবে পৌঁছলেই চলে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রকৃতপক্ষে পড়াশোনা জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই ভালোভাবে শুরু হয়।অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এক বছরে সরকারের ভালো-খারাপ সব ধরনের ঘটনাই ঘটেছে। প্রবৃদ্ধির হার বিতর্কিত হলেও সন্তোষজনক এতে সন্দেহ নেই। বিশেষ করে বছরের প্রথমদিকে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা সত্ত্বেও অর্থনীতির পারফরম্যান্স সন্তোষজনক বলা যায়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অবস্থা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে ছিল সারা বছরই। রফতানি আয় বেড়েছে। বিশ্ববাজারে টাকার মান ছিল স্থিতিশীল। তবে কিছু ব্যর্থতাও ছিল লক্ষণীয়। যেসব প্রকল্প ২০১৪ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল তার বেশির ভাগই শেষ হয়নি। বারবার ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেনের প্রকল্প কাজের অগ্রগতিও ছিল হতাশাব্যঞ্জক। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের উন্নয়ন যথাসময়ে সম্পন্ন হয়নি। বাংলামোটর-মগবাজার-মালিবাগ-মৌচাক ফ্লাইওভারের কাজ মুখ থুবড়ে পড়েছে। এটিও যে সময় শেষ হওয়ার কথা সে সময়ে শেষ হচ্ছে না। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন চরম হতাশাব্যঞ্জক। তবে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ এখনও পর্যন্ত সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে; এটি এখনও পর্যন্ত সরকারের সফলতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।আইটি সেক্টরে বেশ কিছু অগ্রগতি হলেও উন্নত প্রযুক্তিভিত্তিক যন্ত্রপাতি কার্যক্ষেত্রে কোনো সুফল বয়ে আনতে পারেনি। উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেও পদ্মায় ডুবে যাওয়া পিনাক-৬ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অবশেষে মাঝি-মাল্লা ও দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করেও কোনো সফলতা আসেনি। সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে অয়েল ট্যাংকারডুবির দুর্ঘটনায় উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতিও কোনো কাজে আসেনি। শেষে হাঁড়ি-পাতিল দিয়ে শত শত লোক প্রচলিত পদ্ধতিতে তেল সংগ্রহ করতে বাধ্য হয়েছে। তবে সুন্দরবন রক্ষা হয়েছে কিনা তা বলা মুশকিল। এছাড়া সম্প্রতি গভীর নলকূপের পাইপে পড়ে শিশু জিহাদের মৃত্যুর ঘটনায়ও তাই প্রমাণ হয়েছে। উচ্চমানের সিসি টিভি ক্যামেরা ও ‘হোলবোর’ প্রযুক্তি ব্যবহার করেও উদ্ধার করা যায়নি শিশু জিহাদকে। বরং ওই ‘পাইপের ভেতর জিহাদ নেই’ এমন একটি ডাহা ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। পরে স্থানীয় তরুণ দেশীয় প্রযুক্তির দ্বারাই ওই পাইপের ভেতর থেকে মৃত জিহাদকে উদ্ধার করেছে। এসব ঘটনায় সরকারের জন্য দুর্নাম বয়ে এনেছে। এ প্রসঙ্গে রানা প্লাজার উদ্ধার অভিযানের কথা মনে পড়ে। সেখানেও উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও জনসাধারণকে তাদের বাড়ি থেকে খন্তা, কুড়াল, শাবল এবং রান্নাঘরের ছুরি-কাঁচি নিয়ে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। এসব ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, শুধু প্রযুক্তি আনলেই হবে না, তা কাজে লাগানোর জন্য দক্ষ মানুষ সৃষ্টি করতে হবে। তাই মানবসম্পদ উন্নয়নে শাসক দলকে আরও যত্নবান হতে হবে, উপযুক্ত লোককে যথাস্থানে বসাতে হবে।গত এক বছরে জনপ্রশাসনে বেশ কয়েকটি দুঃখজনক ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা (সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্মসচিব) মহান মুক্তিযুদ্ধের সনদ জালিয়াতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে একসঙ্গে চাকরি থেকে বিদায় নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বিদেশীদের সম্মাননা পদক থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ চুরি করে পদকগুলোকে নিুমানের হাস্যাস্পদ সামগ্রীতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারিভাবে তদন্ত হলেও এখন পর্যন্ত দায়ী কর্মকর্তা অথবা রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। সাধারণ মানুষ এতে বিক্ষুব্ধ হয়েছে। এসব দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি। ফলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মর্যাদা ক্ষুণœ হয়েছে। দুদকের সক্ষমতা ও সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া বছরের শেষ সময়ে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে কতিপয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে বিএনপি প্রধানের যে বৈঠক হয়েছে সেটাও দেশের সাধারণ মানুষ কোনোভাবেই ভালো চোখে দেখেনি। এ প্রসঙ্গে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের যে বক্তব্য এসেছে, তা অতীব দুর্বল বলে মনে হয়েছে। তবে সার্টিফিকেট জাল সংক্রান্ত ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ সাধারণ্যে প্রশংসিত হয়েছে।গত এক বছরে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে সফলতা-ব্যর্থতা মিশ্রণে ভরা। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারে সন্তোষজনক অগ্রগতি হয়েছে। অনেক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। বাকি মামলাগুলোরও অনেকদূর অগ্রগতি রয়েছে। তবে একই সময় গুম, খুন ও অপহরণের ঘটনায় দেশের জনগণ শোকগ্রস্ত ও বিক্ষুব্ধ। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জে র্যাবের হাতে ৭ খুনের অভিযোগ মোটামুটিভাবে সত্য বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এটি জাতির জন্য অত্যন্ত কলঙ্ক ও দুঃখজনক ব্যাপার। বহু পুলিশ কর্মকর্তা ও কর্মচারী সরাসরি অপরাধের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছে। এমনকি পুলিশ হেফাজতেও তাদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগে অনেকেই সোচ্চার হয়েছে। দু’এক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের জেলেও পাঠানো হয়েছে। এসব ঘটনায় একটা ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষ শংকিত। রাজনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল সত্ত্বেও এ ব্যাপারে সরকার প্রতিকারমূলক কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পেরেছে বলে মনে হয় না। সেদিক থেকে ২০১৪ সালে নাগরিকদের জন্য সুখবর ছিল না।বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরকারের কয়েকটি বড় অর্জন রয়েছে। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত মামলার রায় বড় ধরনের অর্জন। পাশাপাশি কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিএ) চেয়ারপারসন পদে স্পিকার ড. শিরীন শারমীন চৌধুরী এবং ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) নির্বাচনে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরীর সভাপতি হওয়া দেশের জন্য বড় ধরনের অর্জন ছিল। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী সফরের মাধ্যমে চীন, জাপান, রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সুসম্পর্কের সূচনা হয়েছে বলে মনে হয়। তবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের দৃশ্যমান অবনতি ঘটেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানি ও ল্যান্ড বাউন্ডারি চুক্তিসহ নানা ব্যাপারে বিভিন্ন বক্তব্যে আশার সৃষ্টি করা হলেও গত এক বছরে এর কোনো সুরাহা হয়নি। হয়তো ভবিষ্যতে হবে। তাই ২০১৪ সালকে এ ব্যাপারে হতাশার বছরই বলা হবে। সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা বেড়ে চলেছে। বিএসএফ তথা ভারতের আশ্বাস কোনোভাবেই বাস্তবায়িত হচ্ছে না। বাংলাদেশ এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি।দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে এক ধরনের আতংক। গত বছরের শেষ ও নতুন বছরের শুরুতে দেশের বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দল তথা জোটের মধ্যে এখনও সংঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা এমন বক্তব্য রাখছেন যা শুনলে মনে হয় দেশে যুদ্ধসম অবস্থা বিরাজ করছে। কখন যে এ সর্বনাশা বিস্ফোরণ ঘটবে তা নিয়ে দেশের মানুষ এক অনিশ্চিত শংকায় কালাতিপাত করছে। নির্বাচনের এক বছর পর দেশের মানুষ আশা করছে, যেন আলাপ-আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে দেশের শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়। সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ভিত্তিতে যেন একটি উদার গণতান্ত্রিক সরকার বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়।লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিবযুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে হানিফ ও মির্জা ফখরুলযুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করলে আলোচনা নয়আবদুল্লাহ আল মামুনআওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেছেন, খালেদা জিয়ার ৭ দফার একটিতেও জনগণের জন্য কোনো দিকনির্দেশনা নেই। এটি তাদের নিজেদের স্বার্থেই ঘোষণা করেছে। শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের জন্য তারা নির্বাচন চায়। এই দলটি যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে থেকে একটি অশুভ শক্তি ও অশুভ রাজনৈতিক দল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তাই যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন ও মিথ্যাচার বন্ধ না করলে বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনা হবে না। শনিবার যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। কারওয়ান বাজারে নিজের ব্যবসায়িক কার্যালয়ে মাহবুবউল আলম হানিফ এই সাক্ষাৎকারে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, এ নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, জামায়াত নিষিদ্ধ করার বিষয়, বিএনপির সঙ্গে আলোচনা, দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারসহ সরকারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, জনগণ যদি সরকারের সঙ্গে থাকে তাহলে কোনো অশুভ শক্তি (বিএনপি) দেশকে সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারবে না।সাক্ষাৎকারটি নিচে তুলে ধরা হল-যুগান্তর: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যে ৭ দফা ঘোষণা করেছেন তা সংকট থেকে উত্তরণে একটি ‘গ্রিন সিগন্যাল’ বলে অনেকে মনে করছেন। তাদের ধারণা আওয়ামী লীগের সঙ্গে কথা বলেই বিএনপি নেত্রী এ প্রস্তাব দিয়েছেন?হানিফ : কিসের ৭ দফা, কিজন্য এটা? এখন নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করার সময় আসেনি। সে পরিবেশ এখনও সৃষ্টি হয়নি। নির্বাচনে অংশগ্রহণ একটি ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান। বাংলাদেশের মানুষের এত বিলাসিতা নেই যে কারও খায়েস পূরণের জন্য প্রতি বছর করতে হবে। নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়েই হবে। ওই সময় সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করা হবে যাতে নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করা যায়।যুগান্তর : ৫ জানুয়ারির আগে আপনারা তো বলেছিলেন, এটা নিয়ম রক্ষার নির্বাচন।হানিফ : না, আমরা তো সংবিধানের বাধ্যবাধকতায় নির্বাচন করি। কারণ ওই সময় নির্বাচন না হলে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হতো। তখন সরকারের দায়িত্ব নিত কে ?যুগান্তর : ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ঘোষিত আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে আপনারা জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তখন সে ঐক্য হয়নি। নির্বাচনের পর গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবার জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারপরও সংলাপ নাকচ করছেন কেন?হানিফ : কার সঙ্গে ঐক্য করব? তারা এখনও পাকিস্তানি সৈনিক হিসেবে বিবেচিত। কসাই কাদের মোল্লার রায় কার্যকরের পর পাকিস্তানের পার্লামেন্টে নিন্দা প্রস্তাব উঠল, ওই দিন সে দেশের মন্ত্রী ও এমপিরা বক্তৃতা করলেন যে, কাদের মোল্লা মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত পাকিস্তানের অকুতোভয় সৈনিক ছিলেন। কুখ্যাত রাজাকার, জামায়াতের সাবেক আমীর গোলাম আযম মারা যাওয়ার পর পাকিস্তানে গায়েবানা জানাজা হয়েছে, নিজামীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পর পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নেসার আহমেদ তীব্র নিন্দা প্রতিবাদ জানালেন এবং তারা এখনও এদের পাকিস্তানের সৈনিক হিসেবে ভাবে। সেই পাকিস্তানি সৈনিকদের নিয়ে বাংলাদেশকে যারা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়- তাদের সঙ্গে কিসের আলোচনা? এ আলোচনা কার স্বার্থে হবে? এটাই তো জনগণ জানতে চায়। জনগণ ও দেশের স্বার্থে যে কোনো সময় আলোচনা করতে আওয়ামী লীগ প্রস্তুত। কিন্তু যারা এদেশ ও জনগণকে নিয়ে ভাবে না- তাদের সঙ্গে কী নিয়ে আলোচনা হবে? আর বিএনপি নেত্রী যে ৭ দফা ঘোষণা করেছেন, আমার প্রশ্ন এর মধ্যে একটিতে জনগণের জন্য কোনো দিকনির্দেশনা আছে? শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের জন্য তারা নির্বাচন চায়। তাহলে নির্বাচন কেন, বিএনপিকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসার জন্য?যুগান্তর : বিএনপি তো একটি বড় রাজনৈতিক দল, একাধিকবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল- তারা মধ্যবর্তী নিবাচন চাইছে।হানিফ : আমি তো অস্বীকার করি না বিএনপি রাজনৈতিক দল নয়, বিএনপি রাজনৈতিক দল। তবে যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে থেকে একটি অশুভ শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তারা দেশে একটি অশুভ রাজনৈতিক দল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।যুগান্তর : কিন্তু উল্টো অভিযোগও তো রয়েছে। বিএনপি নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের লেবাস পরে স্বৈরতন্ত্র কায়েম করছে। বিএনপিকে সভা-সমাবেশ করতে দিচ্ছে না। কথায় কথায় ১৪৪ ধারা জারি করা হচ্ছে।হানিফ : বিএনপি নেতাদের কাছে আমিও জানতে চেয়েছি, তারা যে অভিযোগ করছে, কোথায় তাদের সভা-সমাবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না? মির্জা ফখরুল ইসলামসহ সব নেতা সভা-সমাবেশ-সেমিনার করে সরকারকে গালিগালাজ করে যাচ্ছেন। গাজীপুরে সমাবেশ করতে না পারাটা তাদের ব্যর্থতা। খালেদা জিয়ার কুপুত্র তারেক জিয়া লন্ডনে বসে বঙ্গবন্ধুকে রাজাকার বলবেন, কটূক্তি করবেন, জনগণ চেয়েছিল এ ধরনের বক্তব্যের জন্য সে (তারেক) ক্ষমা প্রার্থনা করুক। খালেদা জিয়া এ দায়িত্ব নিতে পারেননি। বিএনপির সব নেতাকে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলবেন, তারেক ভুল বলছেন। তাহলে এই যে ভুল বলছেন তো খালেদা জিয়া কি দায়িত্ব নিয়ে তার কুপুত্রকে দিয়ে ক্ষমা চাওয়াতে পারতেন না? সেটা পারেননি বলেই জনগণ গাজীপুরে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।যুগান্তর : বিএনপি সমাবেশ করতে না পেরে হরতাল দিয়েছে। ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেয়া হয়েছে। মানুষ মনে করছে দেশ আবার সংঘাতের দিকে যাচ্ছে। এ অবস্থার পরও আপনারা সংলাপের প্রয়োজন মনে করছেন না কেন?হানিফ : উদ্বেগ, সংঘাতের আশংকা ছিল। তবে সেটা ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। মানুষ ভেবেছিল দেশ গৃহযুদ্ধের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ সে উদ্বেগ-সংঘাতের আশংকা দূর করেছে। আর জনগণ যদি সরকারের সঙ্গে থাকে, তাহলে এই অশুভ শক্তি কোনো দেশকে সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারবে না।যুগান্তর : কিন্তু বিএনপি তো বলছে জনগণ তাদের সঙ্গে আছে। আর আপনাদের দাবি জনগণ আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছে। এ অবস্থায় বিএনপি একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন চাচ্ছে।হানিফ : সেটা প্রশ্ন আসতেই পারে। তাহলে খালেদা জিয়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে এলেন না কেন? এখন তিনি ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ পালন করতে চান? আসলে তিনিই তো গণতন্ত্র হত্যা করেছেন। এজন্য তাকে অভিযুক্ত করে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত।যুগান্তর : ওই নির্বাচন পশ্চিমা বিশ্ব মেনে নেয়নি। তারা আগে থেকেই বলে আসছে সব দলের অংশগ্রহণ না থাকলে সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না। আর ওই নির্বাচনে বিএনপি ছিল না। শুধু তাই নয়, এখনও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিষয়ে মতামত দিয়ে যাচ্ছে। বিএনপিও মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়ে জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের কথা বলছে। আমরা জানতে পেরেছি আওয়ামী লীগ ভেতর ভেতর সে প্রস্তুতি নিচ্ছে।হানিফ : নির্বাচন তো আর ছেলের হাতে মোয়া নয় যে, কেউ চাইল এটা আমাকে দেন আর দিয়ে দিলাম। সময় যখন হবে তখন কার কতটুকু জনপ্রিয়তা আছে, তা যাচাই করে নেবে। আর হ্যাঁ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সর্বশেষ বিজিএমইএ’র সঙ্গে বৈঠকে বলেছে তারা এ (৫ জানুয়ারি) নিয়ে ভাবছে না। আগামী নির্বাচনটা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হয়Ñ সেটাই তাদের ভাবনার বিষয়।যুগান্তর : তারা তো এ নির্বাচন মেনে নেয়নি?হানিফ : মানছে না কে বলল? এ নির্বাচনে গঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সম্মেলনে অংশ নেননি? সেখানে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা ছিলেন না? তাই যদি হয়, তাহলে সিপিএ, আইপিইউ’র মতো সংগঠনে বাংলাদেশ সভাপতি নির্বাচিত হল কীভাবে? গোটা বিশ্বই তো তাদের সমর্থন দিয়ে সভাপতি নির্বাচিত করেছে। তাহলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন মেনে না নেয়ার কথা আসে কেন?যুগান্তর : এটা সত্যি, তবে তারা এও বলছে যে বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রয়োজন রয়েছে। তার জন্য প্রয়োজন আলোচনার।হানিফ : আলোচনা করব না- তা তো আমরা বলছি না। নির্বাচনের জন্য যখন আলোচনার প্রয়োজন হবে, তখন করব? আমরা বরাবরই বলে আসছি আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে আমরা সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই আলোচনা করব।যুগান্তর : বিএনপির অনেকের অভিযোগ প্রতিবেশী ভারতের অব্যাহত সমর্থনে আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে? আর কোনো মিত্রের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছে না- এটা কি সত্য?হানিফ : খালেদা জিয়ার কাছে আমার প্রশ্ন তার কাছে গণতন্ত্রের ডেফিনেশনটা কি? রাস্তায় নেমে পেট্রল বোমা দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারাটা কি গণতন্ত্র? সেই গণতন্ত্র বাংলাদেশের মানুষ দেখতে চায় না।যুগান্তর : আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকার করা হয়েছে। অথচ দেখা গেছে এ সরকারের আমলেই জঙ্গিবাদী তৎপরতা বেড়ে গেছে। জঙ্গিরা তাদের রাজনৈতিক সহকর্মী আসামি ছিনতাই করেছে পুলিশ হত্যা করেছে। ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন শহর বর্ধমানে বোমা বিস্ফোরণের সঙ্গে বাংলাদেশের জঙ্গিদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। বিএনপি বলছে সরকার জঙ্গিদের প্রতিরোধে সক্রিয় নয়?হানিফ : বিএনপির এ অভিযোগ হাস্যকর। তারাই এদেশটাকে জঙ্গিদের দেশে পরিণত করার সব রকম চেষ্টা করে গেছে। আর বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার জঙ্গিদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছে বলে তারা পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।যুগান্তর : জামায়াতকে নিষিদ্ধের ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে? অভিযোগ রয়েছে, বার বার প্রতিশ্র“তি দেয়ার পরও আওয়ামী লীগ জামায়াতকে নিষিদ্ধ করছে না?হানিফ : বাস্তবতাটা বুঝতে হবে। যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হওয়ার পর খালেদা জিয়া যে তৎপরতা শুরু করেন এবং লবিস্ট নিয়োগ করে আন্তর্জাতিক মহল থেকে চাপ দিয়ে এসেছেন- এ বিচার বন্ধ করার জন্য হরতাল, মিছিল-মিটিং সবই করেছেন। মানুষ ও পুলিশ পুড়িয়ে হত্যা করেছেন। এত বাধার পরও বিচার কাজ এগিয়ে গেছে, রায় হয়েছে, ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। আমরা অপেক্ষা করছি। ধীরে ধীরে জনমত তৈরি করে সেটা (জামায়াতকে নিষিদ্ধ) করব।যুগান্তর : এ সরকারের বিরুদ্ধে একটি বড় অভিযোগ তারা দুদককে প্রতিপক্ষ দমনে ব্যবহার করছে? মন্ত্রী এবং সরকারি দলের এমপিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছেন। বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হচ্ছে-হানিফ : এ অভিযোগ মোটেও ঠিক নয়। আপনি নিশ্চয় জানেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খান ও সংসদ সদস্য বদির বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। সরকারি দলের এমপি বদিকে জেলেও পর্যন্ত যেতে হয়েছে। এরকম বাংলাদেশে আর কখনও দেখা যায়নি। এটা আওয়ামী লীগ সরকার বলেই সম্ভব হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন।সরকার জোর করে ক্ষমতায় থাকার নীলনকশা করছেযুগান্তর রিপোর্টবিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন সংলাপের বিষয়ে সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনকে ভয় পায়, তাই নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে চায় না। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে চায় না বলেই সংলাপেও বসতে আগ্রহী নয়। তারা জোর করে ক্ষমতায় থাকার নীলনকশা চূড়ান্ত করেছে। তিনি বলেন, সাধারণ জনগণের আকাক্সক্ষাকে উপেক্ষা করে ভোটারবিহীন নির্বাচন করে দেশ চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ। ভরাডুবি নিশ্চিত জেনেই নতুন নির্বাচন দেয়ার সাহস পাচ্ছে না সরকার। তিনি বলেন, বিএনপি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে সরকারকে বাধ্য করবে। সেই আন্দোলন ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।৩ জানুয়ারি যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের এক বছরের মূল্যায়ন, বিএনপির বিগত আন্দোলন, ভবিষ্যৎ সরকারবিরোধী আন্দোলনের কৌশল, সাংগঠনিক পুনর্গঠন, সভা-সমাবেশ করতে না দেয়াসহ দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন তিনি।প্রশ্ন : ৫ জানুয়ারি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন।ফখরুল : ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল প্রহসন ও তামাশার। আওয়ামী লীগ গণবিচ্ছিন্ন হয়ে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সব গণতান্ত্রিক দলকে বাইরে রেখে নির্বাচনের নামে নাটক করে জোর করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে তারা গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে।প্রশ্ন : ৫ জানুয়ারি দুই দলের মুখোমুখি অবস্থান সম্পর্কে বলুন।ফখরুল : আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। গণতন্ত্রের প্রতি তাদের ন্যূনতম বিশ্বাস থাকলে মুখোমুখি অবস্থানের কোনো কারণ থাকত না। ফ্যাসিবাদী কায়দায় বিরোধী দল ও মতকে দমন করার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে জনগণকে মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।প্রশ্ন : সমাবেশের অনুমতি না দিলেও ওইদিন থেকেই কি চূড়ান্ত আন্দোলন শুরু হবে।ফখরুল : চূড়ান্ত আন্দোলন বলতে তো কিছু নেই। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে অবৈধ অনৈতিক সরকারের বিরুদ্ধে জনগণ সংগ্রাম করছে। এই সংগ্রাম তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। জনগণের বিজয় অনিবার্য।প্রশ্ন : এবারের আন্দোলনে নেতারা রাজপথে থাকবে কিনা।ফখরুল : সিনিয়র নেতারা সবসময়ই রাজপথে থাকার চেষ্টা করেন। এই ভয়ংকর দানবীয় সরকারের পেটোয়া বাহিনী যখন দেখামাত্র গুলি করে, পুলিশের কর্মকর্তারা যখন রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলেন তখন নেতাকর্মীদের রাজপথে থাকা কঠিন হতে পারে। তবে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন হবে বলে আশা করি।প্রশ্ন : সরকারের এক বছরে কোনো সাফল্য দেখছেন কিনা।ফখরুল: গণতন্ত্র ধ্বংস, মানবাধিকার হরণ, দুর্নীতি, হত্যা, গুম, খুন, মিথ্যা মামলা এসবই সরকারের সাফল্য।প্রশ্ন : সরকারের ব্যর্থতা কি।ফখরুল : রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে না পারা, জনগণের মধ্যে শান্তি-স্থিতিশীলতার আস্থা সৃষ্টি করতে না পারা। জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা বুঝতে না পারাই সরকারের বড় ব্যর্থতা।প্রশ্ন : ঢাকা মহানগর বিএনপির কার্যক্রমে সন্তুষ্ট কিনা।ফখরুল : মহানগর বিএনপির নতুন নেতৃত্ব কাজ করে যাচ্ছে। আগামী আন্দোলনে তারা অবশ্যই সফল হবে বলে আশা করি।প্রশ্ন : তারানকোর সঙ্গে বৈঠকে কোনো সমঝোতা হয়েছিল কিনা।ফখরুল : জাতিসংঘের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর সঙ্গে বৈঠকে কোনো লিখিত সমঝোতা হয়নি। আওয়ামী লীগের একগুঁয়েমি এবং অসৎ উদ্দেশ্যের কারণে কোনো সমঝোতায় আশা সম্ভব হয়নি।প্রশ্ন : প্রয়োজনে আবার নির্বাচন হবে- আওয়ামী লীগ তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে এলো কেন।ফখরুল : আওয়ামী লীগ জনগণ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন। তাদের অবৈধ সরকারের দুঃশাসন, দুর্নীতি তাদের এমন জায়গায় নিয়ে গেছে। যে কোনো নিরপেক্ষ নির্বাচনে তাদের চরম ভরাডুবি হবে জেনে তারা কোনো আগাম নির্বাচন দিতে সাহস পাচ্ছে না। এজন্য আগেই অবস্থান থেকে সরে এসে জোর করে ক্ষমতায় থাকার নীলনকশা করছে। www.24banglanewspaper.com
ভালো-মন্দের এক বছর
২০১৪ সালের শেষ, জাতীয় নির্বাচন এবং সরকার গঠনের এক বছর- এই তিনটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা প্রায় একই সময়ে পড়েছে। সুতরাং এক বছরের অর্জন এবং হতাশা-ব্যর্থতার কথা আলাপ করলে তিনটি বিষয়েই বলা হবে। যে কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা দেশের জীবনে এক বছর বা ৩৬৫ দিনে অনেক কিছুই ঘটে। এতে সফলতা কিংবা ব্যর্থতা- দুটি বিষয়ই থাকে। আমরা সরকারই বলি বা দেশই বলি, দেখা যাবে গত এক বছরে কিছু অর্জন আছে। কিছু ভালো কাজ হয়েছে, যেটা সরকারের সাফল্যগাথার মধ্যে যাবে। আবার অনেক হতাশা, ব্যর্থতা ও দুঃখজনক ঘটনাও ঘটেছে। যেগুলো সরকারের জন্য বিব্রতকর হয়েছে। ভবিষ্যতেও সরকারকে এই বিষয়গুলোর ব্যাপারে নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। সফলতা নিয়ে আলোচনা করলে প্রথমেই ধরতে হবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন। এই নির্বাচনকে দু’ভাবে দেখতে হবে। শাসক দল মনে করে, দেশে একটা নির্বাচন হয়েছে এবং তা একটা চ্যালেঞ্জের মুখে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিরোধী দল বলেছিল, তারা নির্বাচন প্রতিহত করবে। নির্বাচনকে বড়ভাবে বাধাগ্রস্ত করবে। আর শাসক দল মনে করে, সে রকম কোনো বাধা তৎকালীন বিরোধী দল সৃষ্টি করতে পারেনি। নির্বাচন হয়ে গেছে এবং সেই নির্বাচনের মাধ্যমে তারা সরকার গঠন করেছে। তবে নির্বাচনটি কিন্তু একেবারে প্রশ্নাতীত হয়নি। এ নির্বাচনের পক্ষে-বিপক্ষে নানা বক্তব্য আছে। বিশেষ করে বিপক্ষে বড় রকমের বক্তব্য হচ্ছে দেশের প্রায় ৫২ শতাংশ ভোটার নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি। এমনকি দেশের রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ বড় বড় রাজনৈতিক নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও ঠিকমতো ভোট দিতে পারেননি বা ভোট দেননি। ১৫৪টি আসনে বিনা ভোটে প্রার্থীরা এমপি হিসেবে ঘোষিত হয়েছেন। তাদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। এদিক থেকে পার্লামেন্ট গঠনে একটা বিরাট দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে। সংসদের অধিকাংশ সদস্যই বিনা ভোটে পার্লামেন্টে বসার সুযোগ পেয়েছেন। শাসক দলকে এই অভিযোগ সারা জীবন হয়তো বয়ে বেড়াতে হবে। কিন্তু এর ভিত্তিতে শাসক দল প্রশাসনিক দিক দিয়ে সুবিধা পেয়েছে এবং এদিক থেকে সরকার প্রশ্নাতীত অবস্থায় রয়েছে। কারণ রাষ্ট্রের সব প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান সরকারের প্রতি বিনা প্রতিবাদে আনুগত্য প্রকাশ করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মোটামুটিভাবে বিশ্বও সরকারকে কাজ চালানোর মতো স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু মূল বিষয়টি থেকে যাওয়ার কারণে অর্থাৎ গণতান্ত্রিক অধিকার বা ভোট দেয়ার অধিকার হারানোর যে অভিযোগ, এটা কিন্তু সারা বছরই সরকারকে তাড়া করে ফিরেছে; অস্বস্তিতে রেখেছে। নির্বাচনের পর এমন একটি দিন যায়নি যে, কোনো না কোনো মাধ্যমে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে প্রশ্ন করা হয়নি। অর্থাৎ এ বিষয়টি কিন্তু হারিয়ে যায়নি। বছর শেষে এ বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। বছরের শেষ সপ্তাহটিও হরতালের মধ্য দিয়ে কেটেছে। বিগত বছরের বাকি সময়টুকু মোটামুটি নির্ঝঞ্ঝাট ও শান্তিপূর্ণভাবেই অতিবাহিত হয়েছে।যদিও এ সময়ের মধ্যে সরকারের জন্য অনেক বিব্রতকর ঘটনা ঘটেছে। আর তা ঘটেছে নিজের দলের লোকজনের মাধ্যমেই। একে রাজনৈতিক ভাষায় বলা যায় দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। মূল দলের উচ্চপর্যায়ের নেতা-নেত্রীদের বক্তব্য ও আচার-আচরণের কারণে সরকারের জন্য বিরাট সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। এমনকি একজন মন্ত্রীকে শুধু দল ও মন্ত্রিসভা থেকেই বহিষ্কার নয়, বিরূপ মন্তব্যের কারণে জেলেও পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশে বোধহয় এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম। নিজ সরকার ক্ষমতা থাকাবস্থায় আগে কোনো মন্ত্রী জেলে গেছেন বলে আমার জানা নেই।এছাড়াও শাসক দলের অঙ্গসংগঠনগুলো সরকারকে অসুবিধার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের মারামারি, সংঘর্ষ ও সংঘাতে প্রাণহানির অনেক ঘটনা ঘটেছে। আর বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের সশস্ত্র তাণ্ডবে শুধু যে প্রাণহানি ঘটেছে তা নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। বস্তুত আজকে দেশের উচ্চশিক্ষা চরম বিপর্যয়ের মুখে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষায় দুর্নীতি, শিক্ষামানের অবনতি শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের গত পাঁচ-ছয় বছরের সব অর্জন ম্লান করে দিয়েছে। আজকে বাংলাদেশের শিক্ষার মান নিয়ে শাসক দলের মন্ত্রী-এমপি, নেতা ও নিজস্ব ঘরানার লোকদের মধ্যেও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। এসবের মধ্যেও সরকার ঠিক সময়ে বিনামূল্যের বই দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। এটি একটি সরকারের বড় সফলতা। যদিও শিক্ষা ব্যবস্থায় এর গুরুত্ব সমধিক নয়। কারণ পাঠ্যবই মোটামুটি জানুয়ারি মাসের মধ্যেই ভালোভাবে পৌঁছলেই চলে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রকৃতপক্ষে পড়াশোনা জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই ভালোভাবে শুরু হয়।অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এক বছরে সরকারের ভালো-খারাপ সব ধরনের ঘটনাই ঘটেছে। প্রবৃদ্ধির হার বিতর্কিত হলেও সন্তোষজনক এতে সন্দেহ নেই। বিশেষ করে বছরের প্রথমদিকে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা সত্ত্বেও অর্থনীতির পারফরম্যান্স সন্তোষজনক বলা যায়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অবস্থা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে ছিল সারা বছরই। রফতানি আয় বেড়েছে। বিশ্ববাজারে টাকার মান ছিল স্থিতিশীল। তবে কিছু ব্যর্থতাও ছিল লক্ষণীয়। যেসব প্রকল্প ২০১৪ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল তার বেশির ভাগই শেষ হয়নি। বারবার ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেনের প্রকল্প কাজের অগ্রগতিও ছিল হতাশাব্যঞ্জক। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের উন্নয়ন যথাসময়ে সম্পন্ন হয়নি। বাংলামোটর-মগবাজার-মালিবাগ-মৌচাক ফ্লাইওভারের কাজ মুখ থুবড়ে পড়েছে। এটিও যে সময় শেষ হওয়ার কথা সে সময়ে শেষ হচ্ছে না। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন চরম হতাশাব্যঞ্জক। তবে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ এখনও পর্যন্ত সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে; এটি এখনও পর্যন্ত সরকারের সফলতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।আইটি সেক্টরে বেশ কিছু অগ্রগতি হলেও উন্নত প্রযুক্তিভিত্তিক যন্ত্রপাতি কার্যক্ষেত্রে কোনো সুফল বয়ে আনতে পারেনি। উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেও পদ্মায় ডুবে যাওয়া পিনাক-৬ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অবশেষে মাঝি-মাল্লা ও দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করেও কোনো সফলতা আসেনি। সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে অয়েল ট্যাংকারডুবির দুর্ঘটনায় উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতিও কোনো কাজে আসেনি। শেষে হাঁড়ি-পাতিল দিয়ে শত শত লোক প্রচলিত পদ্ধতিতে তেল সংগ্রহ করতে বাধ্য হয়েছে। তবে সুন্দরবন রক্ষা হয়েছে কিনা তা বলা মুশকিল। এছাড়া সম্প্রতি গভীর নলকূপের পাইপে পড়ে শিশু জিহাদের মৃত্যুর ঘটনায়ও তাই প্রমাণ হয়েছে। উচ্চমানের সিসি টিভি ক্যামেরা ও ‘হোলবোর’ প্রযুক্তি ব্যবহার করেও উদ্ধার করা যায়নি শিশু জিহাদকে। বরং ওই ‘পাইপের ভেতর জিহাদ নেই’ এমন একটি ডাহা ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। পরে স্থানীয় তরুণ দেশীয় প্রযুক্তির দ্বারাই ওই পাইপের ভেতর থেকে মৃত জিহাদকে উদ্ধার করেছে। এসব ঘটনায় সরকারের জন্য দুর্নাম বয়ে এনেছে। এ প্রসঙ্গে রানা প্লাজার উদ্ধার অভিযানের কথা মনে পড়ে। সেখানেও উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও জনসাধারণকে তাদের বাড়ি থেকে খন্তা, কুড়াল, শাবল এবং রান্নাঘরের ছুরি-কাঁচি নিয়ে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। এসব ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, শুধু প্রযুক্তি আনলেই হবে না, তা কাজে লাগানোর জন্য দক্ষ মানুষ সৃষ্টি করতে হবে। তাই মানবসম্পদ উন্নয়নে শাসক দলকে আরও যত্নবান হতে হবে, উপযুক্ত লোককে যথাস্থানে বসাতে হবে।গত এক বছরে জনপ্রশাসনে বেশ কয়েকটি দুঃখজনক ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা (সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্মসচিব) মহান মুক্তিযুদ্ধের সনদ জালিয়াতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে একসঙ্গে চাকরি থেকে বিদায় নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বিদেশীদের সম্মাননা পদক থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ চুরি করে পদকগুলোকে নিুমানের হাস্যাস্পদ সামগ্রীতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারিভাবে তদন্ত হলেও এখন পর্যন্ত দায়ী কর্মকর্তা অথবা রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। সাধারণ মানুষ এতে বিক্ষুব্ধ হয়েছে। এসব দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি। ফলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মর্যাদা ক্ষুণœ হয়েছে। দুদকের সক্ষমতা ও সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া বছরের শেষ সময়ে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে কতিপয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে বিএনপি প্রধানের যে বৈঠক হয়েছে সেটাও দেশের সাধারণ মানুষ কোনোভাবেই ভালো চোখে দেখেনি। এ প্রসঙ্গে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের যে বক্তব্য এসেছে, তা অতীব দুর্বল বলে মনে হয়েছে। তবে সার্টিফিকেট জাল সংক্রান্ত ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ সাধারণ্যে প্রশংসিত হয়েছে।গত এক বছরে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে সফলতা-ব্যর্থতা মিশ্রণে ভরা। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারে সন্তোষজনক অগ্রগতি হয়েছে। অনেক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। বাকি মামলাগুলোরও অনেকদূর অগ্রগতি রয়েছে। তবে একই সময় গুম, খুন ও অপহরণের ঘটনায় দেশের জনগণ শোকগ্রস্ত ও বিক্ষুব্ধ। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জে র্যাবের হাতে ৭ খুনের অভিযোগ মোটামুটিভাবে সত্য বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এটি জাতির জন্য অত্যন্ত কলঙ্ক ও দুঃখজনক ব্যাপার। বহু পুলিশ কর্মকর্তা ও কর্মচারী সরাসরি অপরাধের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছে। এমনকি পুলিশ হেফাজতেও তাদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগে অনেকেই সোচ্চার হয়েছে। দু’এক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের জেলেও পাঠানো হয়েছে। এসব ঘটনায় একটা ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষ শংকিত। রাজনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল সত্ত্বেও এ ব্যাপারে সরকার প্রতিকারমূলক কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পেরেছে বলে মনে হয় না। সেদিক থেকে ২০১৪ সালে নাগরিকদের জন্য সুখবর ছিল না।বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরকারের কয়েকটি বড় অর্জন রয়েছে। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত মামলার রায় বড় ধরনের অর্জন। পাশাপাশি কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিএ) চেয়ারপারসন পদে স্পিকার ড. শিরীন শারমীন চৌধুরী এবং ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) নির্বাচনে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরীর সভাপতি হওয়া দেশের জন্য বড় ধরনের অর্জন ছিল। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী সফরের মাধ্যমে চীন, জাপান, রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সুসম্পর্কের সূচনা হয়েছে বলে মনে হয়। তবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের দৃশ্যমান অবনতি ঘটেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানি ও ল্যান্ড বাউন্ডারি চুক্তিসহ নানা ব্যাপারে বিভিন্ন বক্তব্যে আশার সৃষ্টি করা হলেও গত এক বছরে এর কোনো সুরাহা হয়নি। হয়তো ভবিষ্যতে হবে। তাই ২০১৪ সালকে এ ব্যাপারে হতাশার বছরই বলা হবে। সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা বেড়ে চলেছে। বিএসএফ তথা ভারতের আশ্বাস কোনোভাবেই বাস্তবায়িত হচ্ছে না। বাংলাদেশ এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি।দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে এক ধরনের আতংক। গত বছরের শেষ ও নতুন বছরের শুরুতে দেশের বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দল তথা জোটের মধ্যে এখনও সংঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা এমন বক্তব্য রাখছেন যা শুনলে মনে হয় দেশে যুদ্ধসম অবস্থা বিরাজ করছে। কখন যে এ সর্বনাশা বিস্ফোরণ ঘটবে তা নিয়ে দেশের মানুষ এক অনিশ্চিত শংকায় কালাতিপাত করছে। নির্বাচনের এক বছর পর দেশের মানুষ আশা করছে, যেন আলাপ-আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে দেশের শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়। সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ভিত্তিতে যেন একটি উদার গণতান্ত্রিক সরকার বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়।লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিবযুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে হানিফ ও মির্জা ফখরুলযুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করলে আলোচনা নয়আবদুল্লাহ আল মামুনআওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেছেন, খালেদা জিয়ার ৭ দফার একটিতেও জনগণের জন্য কোনো দিকনির্দেশনা নেই। এটি তাদের নিজেদের স্বার্থেই ঘোষণা করেছে। শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের জন্য তারা নির্বাচন চায়। এই দলটি যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে থেকে একটি অশুভ শক্তি ও অশুভ রাজনৈতিক দল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তাই যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন ও মিথ্যাচার বন্ধ না করলে বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনা হবে না। শনিবার যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। কারওয়ান বাজারে নিজের ব্যবসায়িক কার্যালয়ে মাহবুবউল আলম হানিফ এই সাক্ষাৎকারে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, এ নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, জামায়াত নিষিদ্ধ করার বিষয়, বিএনপির সঙ্গে আলোচনা, দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারসহ সরকারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, জনগণ যদি সরকারের সঙ্গে থাকে তাহলে কোনো অশুভ শক্তি (বিএনপি) দেশকে সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারবে না।সাক্ষাৎকারটি নিচে তুলে ধরা হল-যুগান্তর: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যে ৭ দফা ঘোষণা করেছেন তা সংকট থেকে উত্তরণে একটি ‘গ্রিন সিগন্যাল’ বলে অনেকে মনে করছেন। তাদের ধারণা আওয়ামী লীগের সঙ্গে কথা বলেই বিএনপি নেত্রী এ প্রস্তাব দিয়েছেন?হানিফ : কিসের ৭ দফা, কিজন্য এটা? এখন নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করার সময় আসেনি। সে পরিবেশ এখনও সৃষ্টি হয়নি। নির্বাচনে অংশগ্রহণ একটি ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান। বাংলাদেশের মানুষের এত বিলাসিতা নেই যে কারও খায়েস পূরণের জন্য প্রতি বছর করতে হবে। নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়েই হবে। ওই সময় সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করা হবে যাতে নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করা যায়।যুগান্তর : ৫ জানুয়ারির আগে আপনারা তো বলেছিলেন, এটা নিয়ম রক্ষার নির্বাচন।হানিফ : না, আমরা তো সংবিধানের বাধ্যবাধকতায় নির্বাচন করি। কারণ ওই সময় নির্বাচন না হলে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হতো। তখন সরকারের দায়িত্ব নিত কে ?যুগান্তর : ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ঘোষিত আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে আপনারা জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তখন সে ঐক্য হয়নি। নির্বাচনের পর গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবার জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারপরও সংলাপ নাকচ করছেন কেন?হানিফ : কার সঙ্গে ঐক্য করব? তারা এখনও পাকিস্তানি সৈনিক হিসেবে বিবেচিত। কসাই কাদের মোল্লার রায় কার্যকরের পর পাকিস্তানের পার্লামেন্টে নিন্দা প্রস্তাব উঠল, ওই দিন সে দেশের মন্ত্রী ও এমপিরা বক্তৃতা করলেন যে, কাদের মোল্লা মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত পাকিস্তানের অকুতোভয় সৈনিক ছিলেন। কুখ্যাত রাজাকার, জামায়াতের সাবেক আমীর গোলাম আযম মারা যাওয়ার পর পাকিস্তানে গায়েবানা জানাজা হয়েছে, নিজামীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পর পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নেসার আহমেদ তীব্র নিন্দা প্রতিবাদ জানালেন এবং তারা এখনও এদের পাকিস্তানের সৈনিক হিসেবে ভাবে। সেই পাকিস্তানি সৈনিকদের নিয়ে বাংলাদেশকে যারা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়- তাদের সঙ্গে কিসের আলোচনা? এ আলোচনা কার স্বার্থে হবে? এটাই তো জনগণ জানতে চায়। জনগণ ও দেশের স্বার্থে যে কোনো সময় আলোচনা করতে আওয়ামী লীগ প্রস্তুত। কিন্তু যারা এদেশ ও জনগণকে নিয়ে ভাবে না- তাদের সঙ্গে কী নিয়ে আলোচনা হবে? আর বিএনপি নেত্রী যে ৭ দফা ঘোষণা করেছেন, আমার প্রশ্ন এর মধ্যে একটিতে জনগণের জন্য কোনো দিকনির্দেশনা আছে? শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের জন্য তারা নির্বাচন চায়। তাহলে নির্বাচন কেন, বিএনপিকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসার জন্য?যুগান্তর : বিএনপি তো একটি বড় রাজনৈতিক দল, একাধিকবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল- তারা মধ্যবর্তী নিবাচন চাইছে।হানিফ : আমি তো অস্বীকার করি না বিএনপি রাজনৈতিক দল নয়, বিএনপি রাজনৈতিক দল। তবে যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে থেকে একটি অশুভ শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তারা দেশে একটি অশুভ রাজনৈতিক দল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।যুগান্তর : কিন্তু উল্টো অভিযোগও তো রয়েছে। বিএনপি নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের লেবাস পরে স্বৈরতন্ত্র কায়েম করছে। বিএনপিকে সভা-সমাবেশ করতে দিচ্ছে না। কথায় কথায় ১৪৪ ধারা জারি করা হচ্ছে।হানিফ : বিএনপি নেতাদের কাছে আমিও জানতে চেয়েছি, তারা যে অভিযোগ করছে, কোথায় তাদের সভা-সমাবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না? মির্জা ফখরুল ইসলামসহ সব নেতা সভা-সমাবেশ-সেমিনার করে সরকারকে গালিগালাজ করে যাচ্ছেন। গাজীপুরে সমাবেশ করতে না পারাটা তাদের ব্যর্থতা। খালেদা জিয়ার কুপুত্র তারেক জিয়া লন্ডনে বসে বঙ্গবন্ধুকে রাজাকার বলবেন, কটূক্তি করবেন, জনগণ চেয়েছিল এ ধরনের বক্তব্যের জন্য সে (তারেক) ক্ষমা প্রার্থনা করুক। খালেদা জিয়া এ দায়িত্ব নিতে পারেননি। বিএনপির সব নেতাকে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলবেন, তারেক ভুল বলছেন। তাহলে এই যে ভুল বলছেন তো খালেদা জিয়া কি দায়িত্ব নিয়ে তার কুপুত্রকে দিয়ে ক্ষমা চাওয়াতে পারতেন না? সেটা পারেননি বলেই জনগণ গাজীপুরে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।যুগান্তর : বিএনপি সমাবেশ করতে না পেরে হরতাল দিয়েছে। ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেয়া হয়েছে। মানুষ মনে করছে দেশ আবার সংঘাতের দিকে যাচ্ছে। এ অবস্থার পরও আপনারা সংলাপের প্রয়োজন মনে করছেন না কেন?হানিফ : উদ্বেগ, সংঘাতের আশংকা ছিল। তবে সেটা ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। মানুষ ভেবেছিল দেশ গৃহযুদ্ধের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ সে উদ্বেগ-সংঘাতের আশংকা দূর করেছে। আর জনগণ যদি সরকারের সঙ্গে থাকে, তাহলে এই অশুভ শক্তি কোনো দেশকে সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারবে না।যুগান্তর : কিন্তু বিএনপি তো বলছে জনগণ তাদের সঙ্গে আছে। আর আপনাদের দাবি জনগণ আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছে। এ অবস্থায় বিএনপি একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন চাচ্ছে।হানিফ : সেটা প্রশ্ন আসতেই পারে। তাহলে খালেদা জিয়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে এলেন না কেন? এখন তিনি ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ পালন করতে চান? আসলে তিনিই তো গণতন্ত্র হত্যা করেছেন। এজন্য তাকে অভিযুক্ত করে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত।যুগান্তর : ওই নির্বাচন পশ্চিমা বিশ্ব মেনে নেয়নি। তারা আগে থেকেই বলে আসছে সব দলের অংশগ্রহণ না থাকলে সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না। আর ওই নির্বাচনে বিএনপি ছিল না। শুধু তাই নয়, এখনও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিষয়ে মতামত দিয়ে যাচ্ছে। বিএনপিও মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়ে জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের কথা বলছে। আমরা জানতে পেরেছি আওয়ামী লীগ ভেতর ভেতর সে প্রস্তুতি নিচ্ছে।হানিফ : নির্বাচন তো আর ছেলের হাতে মোয়া নয় যে, কেউ চাইল এটা আমাকে দেন আর দিয়ে দিলাম। সময় যখন হবে তখন কার কতটুকু জনপ্রিয়তা আছে, তা যাচাই করে নেবে। আর হ্যাঁ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সর্বশেষ বিজিএমইএ’র সঙ্গে বৈঠকে বলেছে তারা এ (৫ জানুয়ারি) নিয়ে ভাবছে না। আগামী নির্বাচনটা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হয়Ñ সেটাই তাদের ভাবনার বিষয়।যুগান্তর : তারা তো এ নির্বাচন মেনে নেয়নি?হানিফ : মানছে না কে বলল? এ নির্বাচনে গঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সম্মেলনে অংশ নেননি? সেখানে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা ছিলেন না? তাই যদি হয়, তাহলে সিপিএ, আইপিইউ’র মতো সংগঠনে বাংলাদেশ সভাপতি নির্বাচিত হল কীভাবে? গোটা বিশ্বই তো তাদের সমর্থন দিয়ে সভাপতি নির্বাচিত করেছে। তাহলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন মেনে না নেয়ার কথা আসে কেন?যুগান্তর : এটা সত্যি, তবে তারা এও বলছে যে বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রয়োজন রয়েছে। তার জন্য প্রয়োজন আলোচনার।হানিফ : আলোচনা করব না- তা তো আমরা বলছি না। নির্বাচনের জন্য যখন আলোচনার প্রয়োজন হবে, তখন করব? আমরা বরাবরই বলে আসছি আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে আমরা সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই আলোচনা করব।যুগান্তর : বিএনপির অনেকের অভিযোগ প্রতিবেশী ভারতের অব্যাহত সমর্থনে আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে? আর কোনো মিত্রের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছে না- এটা কি সত্য?হানিফ : খালেদা জিয়ার কাছে আমার প্রশ্ন তার কাছে গণতন্ত্রের ডেফিনেশনটা কি? রাস্তায় নেমে পেট্রল বোমা দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারাটা কি গণতন্ত্র? সেই গণতন্ত্র বাংলাদেশের মানুষ দেখতে চায় না।যুগান্তর : আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকার করা হয়েছে। অথচ দেখা গেছে এ সরকারের আমলেই জঙ্গিবাদী তৎপরতা বেড়ে গেছে। জঙ্গিরা তাদের রাজনৈতিক সহকর্মী আসামি ছিনতাই করেছে পুলিশ হত্যা করেছে। ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন শহর বর্ধমানে বোমা বিস্ফোরণের সঙ্গে বাংলাদেশের জঙ্গিদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। বিএনপি বলছে সরকার জঙ্গিদের প্রতিরোধে সক্রিয় নয়?হানিফ : বিএনপির এ অভিযোগ হাস্যকর। তারাই এদেশটাকে জঙ্গিদের দেশে পরিণত করার সব রকম চেষ্টা করে গেছে। আর বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার জঙ্গিদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছে বলে তারা পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।যুগান্তর : জামায়াতকে নিষিদ্ধের ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে? অভিযোগ রয়েছে, বার বার প্রতিশ্র“তি দেয়ার পরও আওয়ামী লীগ জামায়াতকে নিষিদ্ধ করছে না?হানিফ : বাস্তবতাটা বুঝতে হবে। যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হওয়ার পর খালেদা জিয়া যে তৎপরতা শুরু করেন এবং লবিস্ট নিয়োগ করে আন্তর্জাতিক মহল থেকে চাপ দিয়ে এসেছেন- এ বিচার বন্ধ করার জন্য হরতাল, মিছিল-মিটিং সবই করেছেন। মানুষ ও পুলিশ পুড়িয়ে হত্যা করেছেন। এত বাধার পরও বিচার কাজ এগিয়ে গেছে, রায় হয়েছে, ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। আমরা অপেক্ষা করছি। ধীরে ধীরে জনমত তৈরি করে সেটা (জামায়াতকে নিষিদ্ধ) করব।যুগান্তর : এ সরকারের বিরুদ্ধে একটি বড় অভিযোগ তারা দুদককে প্রতিপক্ষ দমনে ব্যবহার করছে? মন্ত্রী এবং সরকারি দলের এমপিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছেন। বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হচ্ছে-হানিফ : এ অভিযোগ মোটেও ঠিক নয়। আপনি নিশ্চয় জানেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খান ও সংসদ সদস্য বদির বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। সরকারি দলের এমপি বদিকে জেলেও পর্যন্ত যেতে হয়েছে। এরকম বাংলাদেশে আর কখনও দেখা যায়নি। এটা আওয়ামী লীগ সরকার বলেই সম্ভব হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন।সরকার জোর করে ক্ষমতায় থাকার নীলনকশা করছেযুগান্তর রিপোর্টবিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন সংলাপের বিষয়ে সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনকে ভয় পায়, তাই নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে চায় না। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে চায় না বলেই সংলাপেও বসতে আগ্রহী নয়। তারা জোর করে ক্ষমতায় থাকার নীলনকশা চূড়ান্ত করেছে। তিনি বলেন, সাধারণ জনগণের আকাক্সক্ষাকে উপেক্ষা করে ভোটারবিহীন নির্বাচন করে দেশ চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ। ভরাডুবি নিশ্চিত জেনেই নতুন নির্বাচন দেয়ার সাহস পাচ্ছে না সরকার। তিনি বলেন, বিএনপি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে সরকারকে বাধ্য করবে। সেই আন্দোলন ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।৩ জানুয়ারি যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের এক বছরের মূল্যায়ন, বিএনপির বিগত আন্দোলন, ভবিষ্যৎ সরকারবিরোধী আন্দোলনের কৌশল, সাংগঠনিক পুনর্গঠন, সভা-সমাবেশ করতে না দেয়াসহ দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন তিনি।প্রশ্ন : ৫ জানুয়ারি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন।ফখরুল : ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল প্রহসন ও তামাশার। আওয়ামী লীগ গণবিচ্ছিন্ন হয়ে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সব গণতান্ত্রিক দলকে বাইরে রেখে নির্বাচনের নামে নাটক করে জোর করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে তারা গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে।প্রশ্ন : ৫ জানুয়ারি দুই দলের মুখোমুখি অবস্থান সম্পর্কে বলুন।ফখরুল : আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। গণতন্ত্রের প্রতি তাদের ন্যূনতম বিশ্বাস থাকলে মুখোমুখি অবস্থানের কোনো কারণ থাকত না। ফ্যাসিবাদী কায়দায় বিরোধী দল ও মতকে দমন করার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে জনগণকে মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।প্রশ্ন : সমাবেশের অনুমতি না দিলেও ওইদিন থেকেই কি চূড়ান্ত আন্দোলন শুরু হবে।ফখরুল : চূড়ান্ত আন্দোলন বলতে তো কিছু নেই। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে অবৈধ অনৈতিক সরকারের বিরুদ্ধে জনগণ সংগ্রাম করছে। এই সংগ্রাম তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। জনগণের বিজয় অনিবার্য।প্রশ্ন : এবারের আন্দোলনে নেতারা রাজপথে থাকবে কিনা।ফখরুল : সিনিয়র নেতারা সবসময়ই রাজপথে থাকার চেষ্টা করেন। এই ভয়ংকর দানবীয় সরকারের পেটোয়া বাহিনী যখন দেখামাত্র গুলি করে, পুলিশের কর্মকর্তারা যখন রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলেন তখন নেতাকর্মীদের রাজপথে থাকা কঠিন হতে পারে। তবে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন হবে বলে আশা করি।প্রশ্ন : সরকারের এক বছরে কোনো সাফল্য দেখছেন কিনা।ফখরুল: গণতন্ত্র ধ্বংস, মানবাধিকার হরণ, দুর্নীতি, হত্যা, গুম, খুন, মিথ্যা মামলা এসবই সরকারের সাফল্য।প্রশ্ন : সরকারের ব্যর্থতা কি।ফখরুল : রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে না পারা, জনগণের মধ্যে শান্তি-স্থিতিশীলতার আস্থা সৃষ্টি করতে না পারা। জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা বুঝতে না পারাই সরকারের বড় ব্যর্থতা।প্রশ্ন : ঢাকা মহানগর বিএনপির কার্যক্রমে সন্তুষ্ট কিনা।ফখরুল : মহানগর বিএনপির নতুন নেতৃত্ব কাজ করে যাচ্ছে। আগামী আন্দোলনে তারা অবশ্যই সফল হবে বলে আশা করি।প্রশ্ন : তারানকোর সঙ্গে বৈঠকে কোনো সমঝোতা হয়েছিল কিনা।ফখরুল : জাতিসংঘের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর সঙ্গে বৈঠকে কোনো লিখিত সমঝোতা হয়নি। আওয়ামী লীগের একগুঁয়েমি এবং অসৎ উদ্দেশ্যের কারণে কোনো সমঝোতায় আশা সম্ভব হয়নি।প্রশ্ন : প্রয়োজনে আবার নির্বাচন হবে- আওয়ামী লীগ তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে এলো কেন।ফখরুল : আওয়ামী লীগ জনগণ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন। তাদের অবৈধ সরকারের দুঃশাসন, দুর্নীতি তাদের এমন জায়গায় নিয়ে গেছে। যে কোনো নিরপেক্ষ নির্বাচনে তাদের চরম ভরাডুবি হবে জেনে তারা কোনো আগাম নির্বাচন দিতে সাহস পাচ্ছে না। এজন্য আগেই অবস্থান থেকে সরে এসে জোর করে ক্ষমতায় থাকার নীলনকশা করছে। www.24banglanewspaper.com
